দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত সাড়ে তিন মাসে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৯২ শতাংশই কোনো হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সভায় বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতির এই ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার মারাত্মক কমতি এবং টিকাদান কার্যক্রমে সঠিক নজরদারির অভাবের কারণেই পরিস্থিতি এমন রূপ নিয়েছে।
মাত্র সাড়ে তিন মাসে ৭০৮ জনের মৃত্যু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল (শনিবার) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ৯৩ জন এবং হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৫ জন। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া সব মৃত্যুকে হামজনিত মৃত্যুই বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৯৮ হাজার ২৬৬ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের। তবে আশার কথা হলো, এ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
টিকা না পাওয়ার ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান কলম্বোর সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান এবং আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি জানান, জুনের প্রথমার্ধ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলার কোনো টিকা পায়নি। মাত্র ৮ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছিল। জুনের শেষ সপ্তাহে এসে মৃত্যু ৭ শ ছাড়িয়ে গেলেও টিকা না পাওয়ার এই হার একই রকম রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৬ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বয়স ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে।
বয়সভিত্তিক মৃত্যুর খতিয়ান:
-
৯ মাসের নিচে: ২৬ শতাংশ
-
৯ থেকে ১১ মাস: ১৪ শতাংশ
-
১ থেকে ২ বছর: ১৩ শতাংশ
-
২ থেকে ৫ বছর: ১৮ শতাংশ
-
৫ থেকে ৯ বছর: ১৩ শতাংশ
-
১০ থেকে ১৫ বছর: ৪ শতাংশ
-
১৫ বছরের বেশি: ১২ শতাংশ
কারচুপি ও অনাচারের কড়া সমালোচনা দেশের এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, “এতদিন প্রচার করা হয়েছে টিকার কাভারেজ ভালো, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না। বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে তারা টিকা পেয়েছে। সমস্ত পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট এবং উপাত্তে কারচুপি করা হয়েছে। নজরদারি ও জবাবদিহিতা না থাকার কারণে এই সব অনাচারের চড়া মূল্য দিতে হলো নিষ্পাপ শিশুদের।”
উদ্বেগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার, বাংলাদেশে আসছে উচ্চপর্যায়ের দল এ বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। তবে কলম্বোর সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং শিশুদের টিকা না পাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ২৫ জুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হামের বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ও তা বোঝার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা।