দীর্ঘ প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের ভ্রমণ ভিসা (ট্যুরিস্ট ভিসা) পুনরায় চালুর খবরে কলকাতার ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে নিউ মার্কেট ও মারকুইস স্ট্রিট এলাকার ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠবে কলকাতার পর্যটন ও খুচরা ব্যবসা।
আজ রোববার (২৮ জুন ২০২৬) থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ভিসা চালুর আনুষ্ঠানিক খবর প্রকাশের পর কলকাতার বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত নিউ মার্কেট ও সদর স্ট্রিট এলাকায় খুশির আমেজ বিরাজ করছে। গতকাল শনিবার (২৭ জুন) মারকুইস স্ট্রিট-ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে এক বিশেষ জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশি পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা, উন্নত সেবা নিশ্চিতকরণ এবং একটি চমৎকার পর্যটকবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও দুই বছরের ধাক্কা কলকাতার ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশি পর্যটকরা বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলের অর্থনীতির একটি অন্যতম বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত চিকিৎসা, উৎসবের কেনাকাটা, সাধারণ পর্যটন ও পারিবারিক ভ্রমণের কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি কলকাতায় আসতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভ্রমণ ভিসা কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ায় কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামে।
বিশেষ করে নিউ মার্কেট, লিন্ডসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এবং মারকুইস স্ট্রিট এলাকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, পোশাকের দোকান, বড় ওষুধের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান এবং দূরপাল্লার পরিবহন ব্যবসা উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, গত দুই বছরে অনেক বড় ব্যবসায়ী কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হন, কেউ কেউ ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করেন এবং অনেক ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি ও লোকসান কাটানোর আশা মারকুইস স্ট্রিট-ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ট্রেডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোতোষ সাহা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “গত দুই বছর আমাদের ব্যবসার জন্য অত্যন্ত কঠিন ও অন্ধকার সময় ছিল। বাংলাদেশি পর্যটকদের সঙ্গে কলকাতার ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের আত্মিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তাদের আবার সানন্দে স্বাগত জানাতে আমরা সবাই পুরোপুরি প্রস্তুত।”
পরিবহন ব্যবসায়ী সঞ্জয় মজুমদার জানান, শুধুমাত্র মেডিকেল বা চিকিৎসার ভিসার ওপর ভর করে এই বিশাল এলাকার অর্থনীতি সচল রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে পরিবহন খাত থেকে শুরু করে হোটেল খাত পর্যন্ত তীব্র লোকসানের মুখে পড়েছিল। নিউ মার্কেট এলাকার কাপড়ের ব্যবসায়ী কামরুদ্দিন মালিক জানান, গত দুই বছরে তাদের বেচাবিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। তবে এখন ভ্রমণ ভিসা চালু হলে নিউ মার্কেট আবারও তার পুরনো রূপ এবং চেনা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একইভাবে ফার্মেসি ও কসমেটিকস ব্যবসায়ীরাও মনে করছেন, বাংলাদেশিরা ওষুধ ও প্রসাধনী প্রচুর পরিমাণে কেনায় তাদের ব্যবসাও এবার চাঙ্গা হবে।
নিরাপত্তা জোরদার বাংলাদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা স্বউদ্যোগে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন। মারকুইস স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার প্রায় ৩৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা নতুন করে পরীক্ষা ও সচল করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অতীতে বাংলাদেশি পর্যটকদের হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ, জরুরি পাসপোর্ট বা অন্যান্য নানা আইনি সমস্যার দ্রুত সমাধানে এই ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশিদের বরণ করে নিতে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত ও মুখিয়ে আছে কলকাতা।