হরমুজে উত্তেজনার জেরে ইরানে রাতভর মার্কিন হামলা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে গেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। বেসামরিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ইরান বলছে, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের কারণেই সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে একটি বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার জবাব হিসেবে রাতভর ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে এটি ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফার সামরিক অভিযান।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলা চালায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী। এতে জাহাজটির যন্ত্রকক্ষ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। হামলার পর একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি অনুমোদিত নৌপথ ত্যাগ করে অন্য পথে চলাচলের চেষ্টা করছিল। একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও নির্দেশনা না মানায় জাহাজটির দিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। পরে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর দাবি, জাহাজটি নিজের অবস্থান শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে নির্ধারিত পথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। একাধিক সতর্কবার্তার পর জাহাজটিকে থামাতে গুলি চালানো হয়। একই সঙ্গে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, প্রণালি বন্ধ থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সমঝোতা মেনে চলার জন্য ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে না লাগানোয় নতুন সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের মূল্য তাদের দিতে হবে।

যুক্তরাজ্যের সমুদ্রবাণিজ্য তদারকি সংস্থা জানিয়েছে, সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হামলার শিকার জাহাজের নাবিকরা জাহাজ ছেড়ে একটি উদ্ধার নৌযানে আশ্রয় নেন।

এর আগে চলতি সপ্তাহে ওমানের জলসীমা অতিক্রমের সময় তিনটি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ঘটনা বাড়তে থাকে।

ইরানের দাবি, তাদের জলসীমার নির্ধারিত পথই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের একমাত্র নিরাপদ রুট। দেশটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হয়েছেন। এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সাম্প্রতিক হামলার মধ্য দিয়ে কার্যত যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটেছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাগুলো ভুলবশত ঘটেছে এবং এ জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। তিনি বলেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ একদিন অবশ্যই নেওয়া হবে এবং এটি জাতির প্রত্যাশা।

অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলার চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। একই সময়ে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ তোলা হলেও, ট্রাম্প নিজেই নতুন কোনো হত্যাচক্রান্তের বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন।

 
 

তাসনিম হোসেন