সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর সরাসরি নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। সোমবার ঘোষিত এই পদক্ষেপটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের অন্যায় ও দীর্ঘদিনের সামুদ্রিক অবরোধের জবাবে তারা 'চোখের বদলে চোখ' নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতির অংশ হিসেবেই ইয়েমেন উপকূলে সৌদি মালিকানাধীন ও দেশটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল জাহাজের যাতায়াত রুখে দিতে এই সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো।
হুথিদের এই অকস্মাৎ ঘোষণার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ জোট। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো ধরণের উসকানি ও নৌ পথ অবরোধের প্রচেষ্টা শক্তির পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমেই নস্যাৎ করা হবে। একই সাথে লোহিত সাগর ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী সৌদি পতাকাবাহী জাহাজগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে নৌ বহর মোতায়েন বাড়িয়েছে জোটটি।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুটটি নিয়ে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় অঞ্চলটিতে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রক্সি যুদ্ধের পরিধিই বাড়বে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের দেশের মূল অবকাঠামোতে আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালী পুরোপুরি সীল করে দিতে যেন হুথিরা পদক্ষেপ নেয়।
বিশ্বব্যাপী তেলের বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই বাব আল-মান্দেব পথ দিয়ে, কেননা সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল ভরসাকেন্দ্র এই সমুদ্রপথ। এই প্রণালী বন্ধ হলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি হু-হু করে কাঁচা তেলের দাম ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে হুথিদের হুমকির খবরের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম খানিকটা উদ্বেলিত হয়েছে এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় সামুদ্রিক বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এহেন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে কূটনৈতিক মহলে। ইরান নিশ্চিত করেছে যে মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর মাধ্যমে কিছু নতুন আপস-প্রস্তাব এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার পর্দার আড়ালের আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়নি। এই কূটনৈতিক সমাধানের আশাতেই বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের বাজার সাময়িকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।