ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও পরবর্তীতে নদীতে ফেলে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনার মাত্র ২৫ দিনের মাথায় এই ঐতিহাসিক ও দ্রুততম রায় ঘোষণা করলেন আদালত। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) এবং একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরাধের এত দ্রুত বিচার ও রায় পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন হত্যার শিকার নিছামনির মা-বাবা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন— আরিফ মিয়া (১৯), হাসান রাকিব (২০) এবং আবু সাইম (১৮)। অন্যদিকে, অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার প্রধান তিন আসামি আরিফ, রাকিব ও সাইমকে ফাঁসির আদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালতের রায়ে তাদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হয়। অপরদিকে, একই অপরাধে জড়িত থাকা অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির বিষয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে, সেখানকার বিচারক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বজলুল করিম চৌধুরী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) আপিল করার কথা জানিয়েছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরকার। অন্যদিকে, রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সাজা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নিহত শিশুটির পরিবার।
মামলার বিবরণ ও পুলিশের তৎপরতা: চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৪ জুন বিকেলে ধোবাউড়া এলাকায় শিশু নিছামনিকে নির্মমভাবে দলবেঁধে বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে আসামিরা। পরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাকে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। পরদিন ১৫ জুন নিছামনির বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে ধোবাউড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পরপরই পুলিশের বিশেষ অভিযানে চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তারা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং পরবর্তীতে আদালতে অপরাধের কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
পুলিশের তদন্ত দল ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্ত শেষ করে এবং মামলার মাত্র ৯ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৩ জুন চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। এরপর আদালত মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ১৯ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের আইনি যুক্তি-তর্ক শুনানি শেষ করেন। ফলে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মাত্র ২৫ দিনের মাথায় এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পন্ন হলো, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।