ভয়াবহ এক পৈশাচিক হামলায় চোখের পলকে চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল আঠারো বছর বয়সী তরুণ জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের পুরো চেনা পৃথিবী। জীবিকার তাগিদে সকালে ঘর থেকে বের হওয়া রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এই এইচএসসি পরীক্ষার্থী দুপুরে বাড়ি ফিরে পেলেন মা আর তিন বোনের রক্তাক্ত, নিথর দেহ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের এই হতভাগ্য পরিবারের বিপর্যয়ের শুরুটা হয়েছিল ২০১৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। সিফাতের বাবা কামাল হোসেন আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ফেরি করে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করা বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর পুরো পরিবার যখন ভেঙে পড়ে, তখন হাল ধরেন মা শাহিনুর বেগম। চরম অভাবের মাঝেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তিনি। মায়ের সেই লড়াইয়ে শামিল হতে সিফাতও পড়ালেখার পাশাপাশি রায়পুর বাজার বণিক সমিতির একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে মাত্র আট হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দেয়।
দুঃখ-কষ্টের পাহাড় ডিঙিয়ে যখন সিফাত তার মা, বড় বোন সায়মা, মেজো বোন ইকরা এবং ছোট বোন শিফাকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছিল, ঠিক তখনই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এক পৈশাচিক হামলায় তাদের সব স্বপ্ন রক্তে বিলীন হয়ে যায়। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সিফাতের মা ও তিন বোন। ঘটনার পর অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়।
বর্তমানে বাবা, মা কিংবা তিন বোন—আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো আপনজন আর অবশিষ্ট নেই সিফাতের। আদি বাড়ি কুমিল্লায় হলেও সেখানেও তাদের তেমন কোনো স্বজন নেই। বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সিফাত শুধু একটি প্রশ্নই বারবার আওড়াচ্ছে, "আমার মা আর বোনদের আসলে কী অপরাধ ছিল? এখন আর কার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে থাকব?"
সিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওমর ফারুক রনি এবং রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত এবং তার ভাই-বোনেরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনার প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিল। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও ভালোবাসায় পরিবারটি বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন একটি সম্ভাবনাময় পরিবারের সদস্যদের এই মর্মান্তিক ও নৃশংস মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক জানান, ঘাতক অন্তর তাদের পূর্ব পরিচিত ছিল এবং সেই সুবাদেই সকালে সে ঘরে ঢোকার সুযোগ পায়। ঘটনার সময় আফরোজা বেগম রানী নামের এক প্রতিবেশীর সাহসী পদক্ষেপ ও বিচক্ষণতায় ঘাতককে ঘরের ভেতর আটকে ফেলা সম্ভব হলেও, ততক্ষণে সিফাতের পুরো পরিবার চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও নির্বাক সিফাত এখন পুরো পৃথিবীতে আক্ষরিক অর্থেই একা।