সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, ষড়যন্ত্র এবং আইনি বাধা উপেক্ষা করে চলতি বছরই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনে রয়েছেন শেখ হাসিনা। ভারতে অবস্থানকালে দেওয়া এই প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, লক্ষ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেছেন যে, দেশে ফেরা তার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষমতার লোভ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই। তিনি বলেন, “আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমার এই সংগ্রাম।” তিনি আরও যোগ করেন, ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো কঠিন সময় পার করে এসেছেন তিনি, তাই মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না।
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা ও পুনরুত্থান দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়; এটি বাংলার মাটি ও মানুষের ইতিহাস এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। ৭৭ বছরের ইতিহাসে দলটি বারবার কঠিন সময়ের মুখোমুখি হলেও প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া হাজারো মামলা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলটির সমর্থনে মিছিল করছেন, যা আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের স্পষ্ট লক্ষণ। কিছু বাংলাদেশবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন করলেও মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শেখ হাসিনা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মূল ভিত্তি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আঘাত হানা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করা এবং সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালানোকে তিনি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন।

গোপন সমঝোতার গুঞ্জন নাকচ বিএনপি বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে তিনি দেশে ফিরছেন—এমন গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার কোনো গোপন দর-কষাকষির বিষয় নয়; এগুলো সাংবিধানিক অধিকার।”
ভারতে অবস্থান করলেও তার মন সবসময় বাংলাদেশে পড়ে আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাবার সমাধি এবং প্রিয় দেশবাসীর কথা ভেবে তিনি প্রতিটি মুহূর্ত অস্থিরতায় পার করেন। তবে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার এবং জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।