জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত লিফটগুলো এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির পরিবর্তে আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার যান্ত্রিক গোলযোগ, চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ মাঝপথে আটকে যাওয়া, সেন্সরের অকার্যকারিতা এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল না থাকায় প্রতিনিয়ত মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ব্যবহারকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং শিউলিমালা ও বিদ্রোহী— এই দুটি আবাসিক হলে সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানি করা ‘আনা ৫৫০’ ব্র্যান্ডের ১৫টি লিফট স্থাপন করা হয়। এই আধুনিক লিফটগুলো বসাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে দুই অনুষদ ভবনে ৬টি এবং দুটি আবাসিক হলে ৯টি লিফট চালু করা হয়।
তবে চালুর পর থেকেই এই লিফটগুলোতে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে শুরু করে। বর্তমানে সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের মোট ৬টি লিফটের মধ্যে দুটিই অধিকাংশ সময় বিকল হয়ে পড়ে থাকে। ফলে সচল থাকা মাত্র চারটি লিফটের ওপর ভর করে প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সচল লিফটগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় সেগুলোও দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
হলের চিত্র ও ত্রুটিপূর্ণ জরুরি যোগাযোগ
অনুষদ ভবনের পাশাপাশি গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে শিউলিমালা ও বিদ্রোহী হলের একাধিক লিফট সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় রয়েছে। যে কয়েকটি সচল আছে, সেগুলোরও সেন্সর ঠিকঠাক কাজ করে না। চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ থেমে যাওয়া, দরজা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ বা না খোলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য ভেতরে থাকা কলিং বেল ও টেলিফোন অকেজো থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে কেউ লিফটের ভেতরে আটকা পড়লে বাইরের কারও সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় থাকছে না।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
লিফটের ভেতরে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম আজাদ বলেন, "সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি লিফটে আমি আরও সাতজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট আটকা ছিলাম। ইমার্জেন্সি বাটন চাপলেও কোনো লাভ হয়নি। পরে দরজার ফাঁক দিয়ে খাতার পৃষ্ঠা নাড়িয়ে বাইরে থাকা লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি। একপর্যায়ে এক শিক্ষকের নজরে এলে আমাদের উদ্ধার করা হয়।"
একই অনুষদের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী বুশরা তাসলিম জানান, তিনি বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ পর্যন্ত তিনবার লিফটে আটকে গেছেন। প্রতিবারই আতঙ্কের মধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। হলে প্রায়ই লিফট বন্ধ থাকে কিন্তু প্রশাসনকে জানিয়েও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।
আইন ও বিচার বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদ তাঁর ভীতি প্রকাশ করে বলেন, "হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বন্ধুদের সহায়তায় কোনোমতে বের হই। বের হওয়ার সময় সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করায় দরজায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আমার ক্লস্ট্রোফোবিয়া (বদ্ধ জায়গায় ভয়) থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ মনে হয়, এখন লিফটে উঠতেই ভয় লাগে।"
লিফট অপারেটরদের উদ্বেগ ও অবহেলার অভিযোগ
শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নন, লিফট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও এই নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিদ্রোহী হলের লিফট অপারেটর আরিফুল ইসলাম স্পষ্ট জানান, হলের ডান পাশের একটি লিফটের কলিং বেল ও টেলিফোন দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অকেজো। কেউ ভেতরে আটকে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানার কোনো ডিজিটাল মাধ্যম নেই। বিষয়টি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানের লিফট আনা হলেও নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। বড় ধরনের কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগেই অচল লিফটগুলো দ্রুত মেরামত করা, ইমার্জেন্সি বাটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।