বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বৈরী আবহাওয়া ও প্রচণ্ড ঢেউয়ের কবলে পড়ে ১৮ জন জেলেসহ দুটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর অন্য একটি ট্রলারের সহায়তায় ১৬ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ জন।
বরগুনার পাথরঘাটা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে, তালতলী উপজেলার ফকিরহাট সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এই ভয়াবহ ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে হঠাৎ সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে উঠলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। আজ বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ দুই জেলের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ জেলেরা হলেন— কালাম পাইকার ও শহীদ। তারা দুজনেই তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা।
উদ্ধার হওয়া জেলে ও স্থানীয় মৎস্য আড়তদারদের সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে তালতলী উপজেলার ফকিরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে দুটি নামবিহীন ট্রলার কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। এর মধ্যে তপন জোমাদ্দারের মালিকানাধীন ট্রলারে ১৩ জন এবং আলমগীর খলিফার মালিকানাধীন ট্রলারে ৫ জন জেলে ছিলেন। রাতে সাগরে আকস্মিক ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে প্রথমে আলমগীর খলিফার ট্রলারটি ডুবে যায়। সেই ট্রলারে থাকা ৫ জেলে জীবন বাঁচাতে সাঁতরে পাশে থাকা তপন জোমাদ্দারের ট্রলারে গিয়ে উঠেন। কিন্তু ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী এবং ঢেউয়ের তীব্রতায় কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় ট্রলারটিও সাগরে তলিয়ে যায়।
এরপর গভীর সাগরে ১৮ জন জেলেই ভাসতে থাকেন। দীর্ঘ সময় মৃত্যুর মুখে লড়াই করার পর, রাত ৩টার দিকে ওই এলাকা দিয়ে যাওয়া অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলার ভাগ্যক্রমে তাদের দেখতে পায় এবং ১৬ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের দ্রুত পটুয়াখালী জেলার মহিপুর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া জেলেরা হলেন— খলিল মাস্টার, রিদয় জোমাদ্দার, দুলাল, ইমরান, ফারুক, আল-امین, মনির, আশরাফুল, জামাল, ইমরান, শামিম, নাসির, সাগর, আছিফ, নাসির ও নুরুজ্জামান। তারা সবাই একই এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এদিকে, নিখোঁজ কালাম ও শহীদের পরিবারে চলছে চরম মাতম। স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় নদীর পাড়ে বসে আহাজারি করছেন তারা। স্থানীয় জেলেরা নিজেদের উদ্যোগে অন্য ট্রলার নিয়ে সাগরের কাছাকাছি খোঁজাখুঁজি চালিয়ে যাচ্ছেন। ফকিরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি বুধবার দুপুরে জানান, সমিতির পক্ষ থেকে নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তবে সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, এই মুহূর্তে গভীর সমুদ্রে আর কোনো মাছ ধরার ট্রলার নেই। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সব ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। নিখোঁজদের উদ্ধারের জন্য ট্রলার প্রস্তুত রাখা হলেও সাগর অত্যন্ত উত্তাল থাকায় এই মুহূর্তে সমুদ্রে নামা সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে তালতলী কোস্টগার্ড স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার আশরাফুল আলম বলেন, “আমরা ট্রলারডুবির খবর পেয়েছি। তবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় এখনো আনুষ্ঠানিক উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায়নি। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলেই আমরা সাগরে তল্লাশি শুরু করব।”
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনা শোনার পরপরই কোস্টগার্ড এবং নৌ-পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সাগর রুক্ষ থাকায় উদ্ধার কাজে বেগ পেতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া ১৬ জন জেলের চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে মহিপুর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।