টানা কয়েক দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে প্রবেশ করায় তিন উপজেলার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই ভাই-বোনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের এই ঘটনা ঘটে। এতে মাটি চাপা পড়ে স্থানীয় মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে সুমি (১৭) এবং কাজলের ভাই আবদুল মজিদের ছেলে মোহাম্মদ তাওসিফ (১১) ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির প্রতি মুহূর্তে অবনতি হচ্ছে। চকরিয়া উপজেলার হারবাং, বরইতলী, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, ফাসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং চকরিয়া পৌরসভার নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর, কোনাখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বদরখালী, ঢেমুশিয়া ও সাহারবিল ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুইত্যাখালী এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বানের পানি প্রবল বেগে লোকালয়ে ঢুকছে। এতে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদ দেলোয়ার বলেন, "ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পর পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে উপজেলা প্রশাসনের জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।"
অন্যদিকে, পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে বারবাকিয়া, রাজাখালী, মগনামা, শিলখালী ও উজানটিয়া ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে— টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার ও সোনাইছড়ি; শিলখালীর হেদায়াতাবাদ, মাঝেরঘোনা, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া; রাজাখালীর বামুলাপাড়া, মৌলভীপাড়া ও উলুডিয়াপাড়া; মগনামার শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজারপাড়া, ধারিয়াখালী, ধরদরীঘোনা, মটকাভাঙা, চেরাংঘোনা, মরিচ্যাদিয়া, রঙ্গিয়াখালী, মগঘোনা, মাঝিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া; উজানটিয়ার মিয়াপাড়া, সাবখালীপাড়া, ঘোষলপাড়া, পেকুয়ারচর ও পেরাসিংগাপাড়া; পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও পশ্চিম গোয়াঁখালী এবং বারবাকিয়া ইউনিয়নের ভারুয়াখালী ও পাহাড়িয়াখালী।
ভোগান্তিতে পড়া স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহু পরিবারের রান্নার ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় উনুন জ্বলছে না। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং জরুরি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পাহাড়ধস ঠেকাতে বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান, পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিয়মিত মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, "অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়সংলগ্ন ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।"