চার বছরে টিলা ধসে ১০ মৃত্যু, তবু ঝুঁকি নিয়ে অর্ধ লাখ মানুষের বসবাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

টানা বৃষ্টি আর অবৈধভাবে টিলার মাটি কাটার কারণে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে আবারও টিলা ধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত চার বছরে জেলায় টিলা ধসে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

বর্ষা মৌসুম এলেই জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় টিলা ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং ঘরবাড়ি ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। তারপরও টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় টিলা ভূমি রয়েছে। এসব এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন।

শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মহাজিরাবাদ এবং কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা এলাকায় টিলা ও রাস্তা কেটে, ছড়া দখল করে বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও দোকান নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়াসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা আইনের তোয়াক্কা না করে টিলার মাটি কেটে বিক্রি করছেন। বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও বাগান তৈরির জন্য এসব মাটি ব্যবহার হয়। এ কারণে বৃষ্টি হলেই টিলা ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, যারা টিলা কাটে তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ দুটিরই ক্ষতি করছে। প্রকৃতিকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত বিষয়টি শক্তভাবে প্রতিহত করা। টিলা কাটার কারণেই প্রতি বছর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।


শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া ও আশপাশের টিলার বাসিন্দা সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ ও জয়ন্তী তাঁতী বলেন, প্রতি বছরই বর্ষায় পাহাড় ধসে ঘর ভাঙে, তবু এখানেই থাকতে হয়। কারণ যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এবারও বসতির পাশের পাহাড়ে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে।


অনুসন্ধানে উঠে এসেছে টিলা ধসে প্রাণহানির ভয়াবহ চিত্র: ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট, শ্রীমঙ্গলের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলা ধসে ৪ নারী শ্রমিক নিহত। একই বছর কুলাউড়ার ভাটেরায় পাহাড় ধসে ৩ শিশু এবং চাতলাপুর চা বাগানে ১ নারী নিহত।

২০২৪ সাল কমলগঞ্জের আদমপুর বনবিটের কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলা ধসে ১ নারী নিহত।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিনগৃহস্থালির কাজের জন্য টিলার মাটি আনতে গিয়ে মাটিচাপায় ১ স্কুলছাত্রী নিহত ও ৩ জন আহত।

এছাড়া টিলার মাটি কাটতে গিয়ে ও বসতঘর ধসে আরও অনেকের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।


মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলেই অভিযান চালানো হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্ষার শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, টিলা ধসে প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চলছে এবং প্রতিটি উপজেলার ইউএনওদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তাসনিম হোসেন