সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কর্মবিরতি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে জনসেবা বাধাগ্রস্ত হয় এবং জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এ কারণে প্রশাসনের সব স্তরে দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সূত্র বলছে, চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ করা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বাধ্যতামূলক অবসরের মুখোমুখি হতে পারেন। আর ২৫ বছর পূর্ণ না হলে সাময়িক বরখাস্তসহ অন্যান্য প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
সরকারের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত বা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আগেই কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য ও বিবৃতি প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের সিদ্ধান্ত বা আদেশ বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে আপত্তি জানাতে, বাধা দিতে বা অন্যকে উসকানি দিতে পারেন না। একইভাবে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ, আন্দোলনে অংশগ্রহণ বা অন্যকে আন্দোলনে উৎসাহিত করাও বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সচিবালয়ের কিছু কর্মচারী সংগঠন বিভিন্ন সময় কর্মবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন ও কলমবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করছে, যা সরকারি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। এসব কর্মসূচির ফলে জনসেবা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া ঘিরে সরকারি কর্মচারীদের কিছু কর্মসূচি প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। পাশাপাশি এসব কার্যক্রমে সেবা গ্রহণে আসা সাধারণ নাগরিকদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম দাবি করেছেন, কর্মচারীদের দাবিদাওয়া আদায়ে পরিচালিত কর্মসূচিগুলো নিয়ম মেনেই পালন করা হচ্ছে এবং এতে প্রচলিত আইন বা আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে না।
এদিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদারে সরকার সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিধানে বেআইনি ধর্মঘট, সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করাকে সরাসরি অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অপরাধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারি সূত্র জানায়, প্রশাসনে পেশাগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করবে। সরকারি কার্যক্রমে বিলম্ব বা গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব কিংবা অবহেলা সহ্য করা হবে না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি। জনসেবা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিকল্প নেই।