কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ২৭

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫ এএম

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাতের এই হামলায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ৯১ জন আহত হয়েছেন। রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে চালানো এই অভিযানকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো।

কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুও রয়েছে।

মেয়র ভিতালি ক্লিচকোর ভাষ্য, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্স কেন্দ্রও ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতে কিছু হামলায় প্রাণহানি বেশি হলেও এবারই রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী। শহরের বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে আঘাত হানা হয়।

হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বড় ধরনের আক্রমণের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। পরে হামলা শুরু হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই কিয়েভের সামরিক শিল্প–সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নিজেদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কিয়েভ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে রাশিয়া।

তবে ইউক্রেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির অভিযোগ, রুশ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তকাচেনকো বলেন, হতাহতদের বড় একটি অংশ শিশু এবং এই হামলা ছিল সাধারণ মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃত আঘাত।

কিয়েভ মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতভর হামলার সময় প্রায় ৫২ হাজার ৫০০ মানুষ ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিশু ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই এক রাতে সবচেয়ে বেশি মানুষের আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দারনিৎস্কি এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন। দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটির বড় অংশ ধসে পড়ে। আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র পাশের একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্রের কাছে বড় গর্ত তৈরি করলে আশপাশের কয়েকটি ভবনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা বিরামহীনভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে রয়েছে বিধ্বস্ত যানবাহন, ভাঙা কাচ ও ভবনের ধ্বংসাবশেষ।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দা স্ভিতলানা জানান, বিমান হামলার সময় তিনি নিজের বাসার করিডোরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনলেও তিনি স্থির ছিলেন। এর আগেও একটি রুশ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। সেই হামলায় তাঁর মা নিহত হন এবং পরে যুদ্ধে প্রাণ হারান তাঁর ছেলেও।

আরেক বাসিন্দা ওলেকসি বলেন, প্রথম বিস্ফোরণের পর বাইরে বের হতেই দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে উড়ে আসা কাচের টুকরোয় তাঁর মুখ গুরুতর আহত হয়। তাঁর দাবি, এটি কোনো সামরিক স্থাপনায় নয়, বরং আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত হামলা।

ইউক্রেনীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, হামলায় তাদের একটি প্রধান গুদাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড মূল্যের ত্রাণসামগ্রী নষ্ট হয়েছে, যা দেশজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

প্রায় ১১ ঘণ্টাব্যাপী কয়েক দফার এই হামলায় শুরুতে ড্রোন এবং পরে ব্যালিস্টিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ভোর পর্যন্ত রাজধানীর আকাশে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে কিয়েভ।

স্থানীয়দের মতে, গত দুই মাসে রাশিয়ার হামলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। হামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রতিটি অভিযান এখন আগের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী, আরও শক্তিশালী এবং বিস্তৃত এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।

তাসনিম হোসেন