চলতি বছরের জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং সীমান্তসহ বিভিন্ন খাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে এইচআরএসএস। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগৃহীত তথ্য এবং অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। আগের মাসে এ সংখ্যা ছিল ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত।
রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধে ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও ১৪৬ জন আহত হন। বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হন। অন্যদিকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে বিএনপির চারজন, আওয়ামী লীগের দুজন, শিবিরের একজন, ইউপিডিএফের একজন এবং একটি চরমপন্থী সংগঠনের একজন সদস্য রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রাজনৈতিক মামলার তথ্য অনুযায়ী, জুনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ২৫৭টি অভিযানে ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন নেতা-কর্মী, বিএনপির ৩৫ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর দুজন রয়েছেন।
প্রতিবেদনে গণপিটুনি ও দলবদ্ধ হামলার ঘটনাকে বিশেষ উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ৬৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া জনতার হামলা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং অভিযান পরিচালনার সময় ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হন।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয় এবং ৭টি মামলায় ১২ জনকে আসামি করা হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক এবং ৭টি মামলা হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগও উঠে এসেছে। জুন মাসে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনের ঘটনায় তিনজন নিহত হন। তাদের মধ্যে দুজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং একজন গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাতজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ১২টি ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা এবং ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের অধিকাংশই শিশু ও কিশোরী। একই সময়ে নির্যাতনের শিকার শিশু ছিল ২৯১ জন, যার মধ্যে ৫৪ জন নিহত হয়েছে।
শ্রমিক অধিকার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। জুন মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। কর্মস্থলের অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জন পোশাকশ্রমিককে আটক করা হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পাঁচটি ঘটনায় দুজন নিহত, দুজন আহত, চারজন গুলিবিদ্ধ এবং একজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইনের বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ১২ জনকে আরাকান আর্মি আটক করেছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ধারাবাহিকতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।