ইসলামে সংগীত বৈধ না অবৈধ—কোরআনের আয়াত ও ব্যাখ্যা ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে সংগীত (গান-বাজনা) বৈধ নাকি অবৈধ—এ বিষয়টি নিয়ে আলেম ও চিন্তাবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে। কেউ কোরআনের কিছু আয়াতের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সংগীতকে নিষিদ্ধ মনে করেন, আবার কেউ বলেন সরাসরি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বিষয়টি নিয়ত ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। এ বিতর্কে কোরআনের কয়েকটি আয়াতকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়।

ইসলামে সংগীত বৈধ‍ না অবৈধ! ইসলাম সংগীত কলা অনুমোদন করে কী করে না, সে বিষয়ে মতবিরোধের অন্ত নেই। কোনো কোনো আলেম সংগীতকে ‘দ্বিনা মালাহি’ আখ‍্যা দিয়ে ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতি। কেউ আবার বাদ‍্যযন্ত্রবিহীন সংগীত পরিবেশনকে অনুমোদন করা যেতে পারে বলে মত দিয়ে থাকেন। আরেক পক্ষ বলেন, রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, কোনো জিনিসের ভালো-মন্দ নির্ভর করে নিয়তের ওপর।
আজকের পৃথিবীতে ভোগবাদী চিন্তা যেখানে প্রকট, প্রাচ‍্য এবং পাশ্চাত্যের ভোগবাদী দুনিয়া যখন সংগীতের ঝংকারকে মানবতাবিরোধী কাজে ব্যবহার করে সমাজে পাশবিক উচ্ছৃংখলতা বিস্তার করে চলেছে, তখন ইসলাম সেই উন্মত্ত সংগীতের কুপ্রভাব থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে পারবে কি না সে কথাটা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা উচিত। আজকের প্রেক্ষাপটে সংগীতের মতো সুকুমার শিল্পকলাকে জীবন থেকে বাদ দেওয়ার বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার আগে আমাদের ভেবে দেখতে হবে, ইসলামের গাইড বুক আল কোরআনে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা বা দালিলিক প্রমাণ আছে কি না। অর্থাৎ কোনো আয়াত নাজিল হয়েছে কি না।
না! গান অর্থে غناء (গিনা), না বাজনা অর্থে معازف (মা'আযিফ) —কোরআনে এ শব্দগুলো একবারও উচ্চারিত হয়নি। এমনকি কোরআনের কোথাও ‘গান হারাম’, ‘বাজনা নিষিদ্ধ’, কিংবা ‘সুর শয়তানের কাজ’— এমন ভাষাও উচ্চারিত হয়নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে আলেমগণ গান-বাজনাকে হারাম বলেন?
গান-বাজনা সম্পর্কে মওলানাগণ কোরআনের যে কয়েকটা আয়াতের ব্যাখ্যা করে দলিল দেন, সেগুলো হলো,
সুরা লোকমান- ৩১ঃ৬ وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَهۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّ یَتَّخِذَهَا هُزُوًا ؕ اُولٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٌ مُّهِیۡنٌ ﴿۶ '﴾মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞ লোকদের আল্লাহর পথথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে [1] এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। [2] ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।' — এখানে ‘অসার বাক্য’কে মনে করা হয়েছে গান-বাজনা।
সুরা ইসরা- ১৭ঃ৬৪
'তোমার আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্যে যাকে পার সত্যচ্যুত কর, [1] তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর [2] এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরিক হয়ে যাও [3] ও তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও। [4] আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনা মাত্র।' [সুরা ইসরা- ১৭ঃ৬৪] এখানে ‘আওয়াজ’ এবং ‘শয়তানের প্রতিশ্রুতি’কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন গান-বাজনা!
সুরা শু’আরা ২৬ঃ২২৩-২২৬
'ওরা কান পেতে থাকে এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। [1] আর কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা। তুমি কি দেখো না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সকল বিষয়ে কল্পনাবিহার করে থাকে? এবং তা বলে, যা করে না।' [সুরা শু’আরা ২৬ঃ২২৩-২২৬]
— এখানেও সম্মানিত আলেমগণ গান-বাজনা মনে করেছেন।
আগেই বলেছি গান’ শব্দের আরবি হচ্ছে – 'غناء (গিনা/গিনাআ)’ এবং ‘বাদ্যযন্ত্র’ শব্দের আরবি হচ্ছে معزف (মা’য়াজিফ), আর ‘বাদ্যযন্ত্র বাজানো’ আরবি হচ্ছে عَزَفَ (আজাফা)।
বাস্তবতা হলো সমগ্র আল কোরআনের কোথাও এই শব্দগুলো ব‍্যবহৃত হয়নি, একবারের জন্যও ব্যবহৃত হয়নি। সংগীত এত বড় একটা শিল্প, সেটা হারাম করার ব‍্যপারে আল্লাহর সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই কেন? ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সংগীত হারাম করতে হচ্ছে কেন? এর উত্তর খোঁজার আগে জেনে নেওয়া যাক
সংগীত কী?
সংগীতের উৎপত্তি ধ্বনির সমষ্টি থেকে। আর ধ্বনির সৃষ্টি হয়েছে দুটি বস্তুর সংঘর্ষের ফলে। আমরা জানি, পৃথিবী আপন কক্ষপথে ঘোরার ফলে বাতাসের সাথে তার নিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে একপ্রকার ধ্বনি তরঙ্গ। সেই ধ্বনি তরঙ্গই সৃষ্টি করেছে এক ধরনের মধুর সুর। বাতাসে কান পাতলেই বিশেষ স্কেলে বাঁধা বাতাসের সেই সুর শোনা যাবে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীটাই সুরময়। এখানে বাতাসে সুর, গাছের পাতার আন্দোলনে সুর, নদীর কলতানে সুর, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে সুর, সাগরের জোয়ারে সুর। আল্লাহর পৃথিবী তো এক সুরের রাজ‍্য। আর ছন্দ বা তাল ছাড়া তো পৃথিবী অচল।
একই ছন্দে সমান তালে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত হচ্ছে । তালে তালে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত ষড়ঋতুর বর্ষ পরিক্রমা ঘটছে। তাল লয় ছন্দে বাঁধা আছে আমাদের নাড়ির স্পন্দন, হার্টবিট, হাঁটাচলা, কাজকর্ম সব কিছুই। তাল বা ছন্দ হারিয়ে গেলে পৃথিবীটাই অচল হয়ে পড়বে।
সুতরাং সুর ও তালের সমন্বয়কে যদি সংগীত বলা হয়, তাহলে আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীটাই সংগীতময় ।
জীবনের উষালগ্ন থেকেই সংগীত আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মানব সভ‍্যতার শুরু থেকেই সংগীত আমাদের সাথী। এমন কোনো মানুষ নেই যিনি কোকিলের কুহু ডাকে মুগ্ধ হন না, আজানের সুরে বিমোহিত হন না। হৃদয়ের প্রশান্তি, মনকে আনন্দ দান ও সুখানুভূতির জন‍্য মানব জীবনে সংগীত অপরিহার্য। আনন্দ-ফুর্তিতে উৎফুল্লচিত্ত থাকা ইসলামে অন‍্যায় নয়।
ইসলাম একটি বাস্তববাদী জীবন বিধান। নভোমণ্ডলে বিচরণকারী মানুষকে ফেরেশতা মনে করে ইসলাম তার বিধান তৈরি করেনি। ইসলাম মানুষকে হাটে মাঠে বিচরণকারী মানুষ হিসেবেই তার বিধান তৈরি করেছে। মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভাবধারার ওপর লক্ষ‍্য রেখেই ইসলাম হারাম -হালালের বিধান দিয়েছে। সুতরাং মানব জীবনের ওপর অসামান্য প্রভাব বিস্তারকারী সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সাথী, আধ‍্যাত্মিক জীবনের অনুপ্রেরণা, জীবনের জন‍্য অতীব প্রয়োজনীয় সংগীত-কলাকে ইসলাম উপেক্ষা করবে কী করে!
সংগীত শুধু বিনোদন নয়, সংগীত মানুষকে তার সৃষ্টি, স্রষ্টা, জীবন, মৃত্যু, পরিবর্তন ও কর্মফলের গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে। আত্মোপলব্ধি ও ধ্যানে সংগীত অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। যেমন, সুফিবাদে সংগীত এক গভীর ‘জিকর’-এর রূপ— যা আল্লাহর স্মরণে অন্তরকে সজীব ও নরম করে তোলে। সংগীত শুধুই শ্রবণ নয়, এটি একটি ধ্যান (meditation)। ধ্যানের সময় নির্দিষ্ট সংগীত— মনকে স্থির করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ১০ মিনিট শান্ত সুরে ধ্যান করলে মানসিক চাপ কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং হৃদয়-সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং বলা যেতে পারে সংগীত, সুর ও তাল— এগুলো আল্লাহর দেওয়া দেহ ও হৃদয়ের ভাষা।
পবিত্র কোরআনে সুমধুর সুরকে পরোক্ষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে । যেমন আল্লাহ দাউদ (আ.)-কে দিয়েছিলেন সংগীত মোজেজা।
সূরা সাবা ৩৪:১০
وَلَقَدْ ءَاتَيْنَا دَاوُۥدَ مِنَّا فَضْلًۭا ۖ يَـٰجِبَالُ أَوِّبِى مَعَهُۥ وَٱلطَّيْرَ ۖ 'আমি দাউদকে আমার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করেছি— হে পাহাড়সমূহ! তোমরা তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিধ্বনি করো! এবং পাখিরাও!'
এখানে 'আওয়াবি' অর্থ সংগীতে সাড়া দাও, প্রতিধ্বনি করো।
এটি একটি সাংগীতিক দৃশ্য এবং দাউদ (আ.)-এর কণ্ঠ এতটাই মোহনীয় ছিল যে, পাহাড় ও পাখিও সাড়া দিত।
কোরআন বলছে, 'নিশ্চয়ই গর্ধবের স্বর বড়ই অপ্রীতিকর।' (৩১:১৮)। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার কণ্ঠধ্বনি দ্বারা কোরআন মজিদের আবৃত্তিকে সুষ্ঠু ও সুমধুর করে তোলো, সকল বস্তুর জন‍্যই অলঙ্কার রয়েছে, পাক কোরআনের অলঙ্কার সমধুর সুর।'
বোখারি শরীফে উল্লেখ আছে, 'হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, আনসার বংশের এক ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন নবী করিম (সা.) বললেন, হে আয়েশা! ওদের সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তির ব‍্যবস্থা কিছু নেই? আনসাররা তো এগুলো বেশ পছন্দ করে।'
বোখারি ও মুসলিম শরীফে পাওয়া যায়, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘তাঁর কাছে উপস্থিত থেকে দুই মেয়ে ঈদুল আজহার দিনে গান গাইছিল আর বাদ‍্য বাজাচ্ছিল। নবী করিম (সা.) কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। এ সময় হজরত আবুবকর (রা.) সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি মেয়ে দুটিকে ধমকালেন। নবী করীম (সা.) মুখের কাপড় সরিয়ে বললেন,‘হে আবু বকর! ওদের গাইতে দাও। এখন তো ঈদ উৎসব!
ইবনে মাজার এক হাদিসে পাওয়া যায়, হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর এক নিকটাত্মীয় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন আনসার বংশের এক ছেলের সাথে। তখন নবী করীম (সা.) এসে জিজ্ঞাসা করলেন, দুলহিনকে কি পাঠিয়ে দিয়েছো? লোকেরা বলল জি হ‍্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ‘আনসার বংশের লোকেরা খুব গান পছন্দ করে। এ কারণে দুলহিনের সাথে তোমরা যদি এমন একটা মেয়ে পাঠাতে যে গাইত।'
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. হাসান জামান তাঁর সমাজ ও সংস্কৃতি বইতে লিখেছেন, ‘খন্দকের যুদ্ধে হজরত (সা.) পরিখা খননের সময় সাহাবাদের সঙ্গে কাজ করতে করতে সুর করে গেয়েছিলেন, 'লা খাইরা ইল্লা খাইরাল আখিরা আল্লাহুম্মা আরহামাল আনসারা ওয়াল মুহাজিরা।' অর্থাৎ আখিরাতের শুভ ছাড়া শুভ নাইকো আর আনসার আর মুহাজিরে রহম কর পরওয়ার দিগার।'
হানাফি মাজহাবের প্রখ‍্যাত ও সর্বমান‍্য মুফতি হজরত কাজি সানাউল্লাহ পানিপথী (র.) তাঁর বিখ‍্যাত ‘রিসালায়ে সামা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বিবাহের প্রচারকার্যে যদি ‘দফ’ বাজানো জায়েজ বা মোস্তাহাব হয়ে থাকে, তবে দফ তানপুরা আর নাকাড়া ইত্যাদি অন‍্যান‍্য বাদ‍্য যন্ত্রের মধ্যে কী পার্থক্য থাকতে পারে।'
বিশ্ববিখ‍্যাত শাহানশাহে আউলিয়া, ইসলামের শ্রেষ্ঠতম মোবাল্লেগে আজম হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (র.) সম্বন্ধে ‘সিয়ারুল আরেফিন’, ‘মালফুজাতে খাজেগান চিশতি’ প্রভৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, তিনি সুমধুর সুররাজি, মনোহর রাগরাগিনী এবং মারেফতি গজলকে আসরারে এলাহি বা আল্লাহ তাআলার নিগূঢ়তম রহস্য বলে জানতেন। সংগীতের প্রতি হজরত খাজা গরিবে নেওয়াজের অপরিসীম অনুরাগ ছিল।
হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (র.)-এর প্রধান খলিফা হজরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (র.) দফ রবাব, আড়বাঁশি সহযোগে ‘সামার’ মাহফিল করতেন।
বিশিষ্ট আউলিয়া হজরত খাজা নিজামুদ্দিন মাহবুবে এলাহির প্রিয় শিষ‍্য হজরত আমির খসরু (র.) যিনি ভারতী ক্লাসিক‍্যাল মিউজিকের জনক নামে পরিচিত, তিনি তো বহু রাগ-রাগিনী সৃষ্টিসহ.ঢোল, তবলা, সেতার প্রভৃতি বাদ‍্যযন্ত্র উদ্ভাবন করে পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন!
মিসরের বিখ‍্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা ইউসুফ কারজাভি তাঁর ‘আল হালাল ওয়া হারাম ফিল ইসলাম’ বইতে লিখেছেন, ‘যাঁরা বলেন যে, গান ঠিক নয়, তারা অবশ‍্যই ভ্রষ্ট। তাঁদের প্রতিবাদ করে ইবনে আজম লিখেছেন, রাসূলে কারিম (সা.) বলেছেন, কার্যাবলীর ভালোমন্দ নির্ভর করে নিয়তের ওপর।'
ইসলামের সুবহে সাদেক যুগের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও আমরা দেখতে পাব, সে যুগের মুসলমানরা শুধু সংগীত চর্চাই করেননি, আরব, পারস‍্য, স্পেন, ভারত উপমহাদেশজূড়ে মুসলমানরাই ছিল বিশ্বসংগীতের গুরু, সংগীত বিজ্ঞানের আবিষ্কর্তা, সভ‍্য দুনিয়ার সংগীত শিল্পের নেতা, সুর তাল, রাগরাগিনী, বাদ‍্যযন্ত্র এবং তাল যন্ত্রের উদ্ভাবক। সুরের সুমিষ্টতায় মুসলিম সংগীতকলা পাশ্চাত্যে আজও আদর্শ সংগীত রূপে আদৃত। দশম এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলিম সংগীতকলার উৎকর্ষ বিশ্ব সংস্কৃতির এক অনন‍্য অবদান হিসেবে স্বীকৃত হয়। স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ইরান, ভারতসহ মধ‍্য এশিয়ায় মুসলিম সংগীতকলার প্রভাব আজও বিদ‍্যমান ।
ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, খলিফা হারুনের ইব্রাহিম ও ইসাহাক মাওসালি নামে দুজন সংগীতশিল্পী ছিলেন। আল খলিল ছন্দ বিদ‍্যার প্রথম পুস্তক রচনা করেন।
দার্শনিক আল কিন্দি সংগীত ও সুরের ওপর বহু পুস্তক রচনা করেছেন।
বিখ‍্যাত ইমাম গাজজালি বৈধ‍ এবং অবৈধ‍ সংগীতের এক ফিরিস্তি দান করেন। এবং আধ‍্যাতিক ও ধর্মীয় সাধনায় সংগীতকে কিভাবে ব‍্যবহার করা যায় সে সম্মন্ধে তাঁর রচিত ‘এহিয়া উল উলুম’ বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। খলিফা ওলিদ ‘কিতাবুল কিয়ান' নামক সুরের পুস্তিকা রচনা ছাড়াও তিনি নিজে একজন সুদক্ষ লুট (বাঁশি) বাদক ছিলেন।
আরবিতে লিখিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংগীত গ্রন্থ হলো আবুল ফজল ইস্পাহানি রচিত ২১ খণ্ডের সংগীত পুস্তক। এই পুস্তকে তিনি একশত সুরের নাম, তাদের ব‍্যাখ‍্যা ও উৎস আবিষ্কার করে দেখিয়েছেন এবং সে সব সুরের প্রকৃতি ও পরিবেশ বর্ণনা করেছেন। যা একটি দুরূহ কাজ হিসেবে পরিচিত।
খলিফা আব্দুর রহমান কার্ডোভায় প্রথম একটি সংগীত বিদ‍্যালয় স্থাপন করেন। এই বিদ‍্যালয় থেকে বহু কৃতী ছাত্র পরে সংগীত শিল্পে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।
বিখ্যাত খলিফা হারুনের পুত্র ইবরাহিম সে যুগের সংগীত শিল্পীদের মধ‍্যে অন‍্যতম ছিলেন।
ভারত উপমহাদেশের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাব মুসলমানরা এ দেশে শুধু তাওহিদের অমিয় ধারাই বয়ে আনেননি, সাথে করে এনেছিলেন বাদ‍্যযন্ত্র, চিত্রকলা, স্থাপত্যকলা, সংগীত এবং রুচিকর আহার্য‍্য প্রস্তুত প্রণালি।
সুলতান মাহমুদ একজন সংগীতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সংগীতানুরাগী ছিলেন। তাঁর সভায় যেসব শিল্পী সংগীতে খ‍্যাতি অর্জন করেছিলেন তার মধ‍্যে নাজির খান বাহরুজ, চাংগী এবং সুবিখ‍্যাত আমির খসরু অন‍্যতম।
সম্রাট আকবরের সভা গায়ক তানসেন একটি বিশ্ববিশ্রুত নাম। তিনি বহু জনপ্রিয় রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে গেছেন।
উপমহাদেশের ধ্রুপদ সংগীতের আলোচনা করতে গেলেও প্রথমেই মুসলিম সংগীতজ্ঞদের নাম মনে আসবে। যেমন সুলতান হুসেন শাহ শর্কী, নিয়ামত খাঁ (সদারঙ্গ), মুহাম্মদ শাহ, শেখ মইনুদ্দিন, ওয়াজির আলি, ফিরোজ খাঁ (অদারঙ্গ), দুদ্দু খাঁ, হস‍্যু খাঁ এবং স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ ওস্তাদ করিম খাঁ।
এ ছাড়া ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ, ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ কেরামতউল্লা খাঁ প্রমুখ শত শত মুসলিম সংগীত বিশারদের অবদান ভারত উপমহাদেশের সংগীতকলাকে চির ভাস্বর চির অমর করে রেখেছে।
মুসলিম আমলে সংগীতের বন্দিশ বা বাণী ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের গুণকীর্তন সমৃদ্ধ। যেমন ‘তু করিম হ‍্যায়, তু রহিম হ‍্যায়, কিংবা ‘ আরজ শুনো মোরি, তুম দাতা ম‍্যায় ভিখারি’ ইত‍্যাদি।
উপমহাদেশে মুসলমানদের পতনের সাথে সাথে তাদের সংগীত ঐতিহ্যেরও পতন ঘটে।
আজ সবকিছুর মতো মহান সংগীত শিল্পটিও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফলে সংগীত শিল্পে অনুপ্রবেশ করেছে ব‍্যভিচার, নৈরাজ্য ও অবক্ষয়।
সংগীত চর্চা থেকে মুসলমানরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলেই সংগীত নির্লজ্জতা ও যৌনতা প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এ দোষ সংগীতের নয়, সংগীতকে যারা কুপথে ব‍্যবহার করছে দোষ তাদের।
মুসলমানরা যতদিন সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, ততদিন তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নৈতিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেই সংগীত চর্চা করেছিল। সংগীত জগৎ থেকে মুসলমানরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলেই সংগীতে হারাম জিনিসের বিস্তৃতি ঘটেছে। এই বিকৃতির জন‍্য সংগীত দায়ী নয়, দায়ী এর ব্যবহারকারীগণ।
মানব জীবনে বিশুদ্ধ সংগীতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইমাম গাজজালি সংগীতকে স্নায়ু ও মস্তিষ্কের খাদ‍্যরূপে বর্ণনা করেছেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা সংগীতকে চরিত্র সংশোধনের যন্ত্ররূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, সংগীত চর্চা মানুষের মনে এক আন্তরচেতনা জাগায়, যা ক্রমে ক্রমে তাঁকে নিয়ে যায় উন্নততর আধ‍্যাত্মিকলোকে। সংগীত মানুষের কল্পনাশক্তিকে উদ্দীপিত করে সৃষ্টিশীল প্রতিভার উন্মেষ ঘটায়। সংগীত হৃদয়ে কোমল ও নির্মল ভাবের উদ্রেক করে মানুষের মনের অপরাধ প্রবণতা দূর করতে সহায়তা করে। সংগীত মানুষের মনে এক অনাস্বাদিত আনন্দের অনুভূতি জাগায়। ফলে কিছু সময়ের জন্য হলেও সে ভুলে যায় দুঃখ কষ্ট. দিন যাপনের ও প্রাণ ধারণের গ্লানির কথা।
সংগীতের মোহনীয় শক্তি মানুষকে আত্মোন্নতির পথে সাহায্য করে।মানুষের মনে সুপ্ত ধর্মভাব জাগিয়ে হৃদয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রেম জাগরিত করে, যিনি তার কণ্ঠে এই সুর সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার পায়ে আত্মনিবেদনের জন‍্য ব‍্যাকুল করে তোলে। মুসলমান সংগীতজ্ঞগণ সুমধুর সুররাজিকে, মনোহর রাগরাগিনীকে আল্লাহ পাকের নিগূঢ়তম রহস‍্য বা ‘আসরারে এলাহি’ বলে মনে করতেন।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ বলেছেন, সংগীত চর্চার দ্বারা মানুষের সুকুমারবৃত্তিগুলো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। নিখুঁতভাবে সুর লাগাতে পারলে সৃষ্টিকর্তার দর্শন লাভ সম্ভব। অর্থাৎ সংগীতকে একধরনের তপস‍্যা মুজাহাদা বা ইবাদত বলা যেতে পারে।
পদার্থ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সংগীত আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু হওয়ার যোগ‍্যতা রাখে (জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হারমান ভন হেলমহোল্টজ।) তাঁরা এটাও বলেছেন, ‘এটা একেবারে আজগুবি নয় যে, সুমধুর সংগীত দ্বারা বায়ুমণ্ডলের পরিবেশকে পরিশুদ্ধ করে সর্বনাশা ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবীকে পরিশুদ্ধ করা যেতে পারে।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, তাল-লয় সমৃদ্ধ সমধুর সংগীত দ্বারা অধিক শস‍্য ফলানো এবং দুগ্ধবতী গাভীকে অকৃপণভাবে দুগ্ধদানে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। সংগীতের মূর্চ্ছনা দ্বারা উটকে দ্রুতগামী করার রেওয়াজ তো আরবে বহুদিন থেকেই প্রচলিত ছিল। সংগীত দ্বারা মানুষ তো অবশ‍্যই, বনের পশুপাখিকেও বশ করা যায়।
আসল কথা হলো, শরীয়তের বিধান প্রণয়নে সর্বপ্রথম মৌলনীতি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন‍্য যত জিনিসই সৃষ্টি করেছেন, তা সবই হালাল বা মুবাহ।
শরিয়তের বিধান রচয়িতার অকাট‍্য, সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত ঘোষণায় যদি কোনোটিকে হারাম বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, তবে সেটাই কেবল হারাম হবে। কোনো বিষয় যদি অকাট‍্য ঘোষণা দ্বারা প্রমাণিত না হয়, কোনো দলিল থেকে সুস্পষ্টভাবে কোনো বিষয়ের হারাম হালাল হওয়ার কথা যদি প্রমাণ না হয়, তাহলে বিষয় বা বস্তুটি মৌল অবস্থা (কাটছাঁট না করে) মুবাহ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটাকে হারাম বলা যাবেনা।
ইসলামের দ্বিতীয় মৌলনীতি হচ্ছে , হালাল হারাম ঘোষণা করার অধিকার একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার। সুরা আল আনআমে বর্ণনা করা হয়েছে, আল্লাহ যা কিছু তোমার জন‍্য হারাম করেছেন, তা তিনি নিজেই স্পষ্ট এবং ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের জন‍্য বলে দিয়েছেন।' সুতরাং হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজ চিহ্নিত করার কোনো অধিকার, কোনো আলেম বা ফিকহবিদের নেই।
সুতরাং ঘর পুড়ছে বলে দিয়াশলাই উৎপাদন নিষিদ্ধ করা সুচিন্তার লক্ষণ নয়। আজকের সমাজকে ‘চোলি কা পিছে’ জাতীয় কু-সংগীতের কু-প্রভাব মুক্ত করতে হলে , শিশু থেকে বৃদ্ধ, জীবন্ত থেকে মৃত লাশকে রেপ করার মতো ঘৃণ্য ব‍্যাধি মুক্ত সমাজ গড়তে হলে শুদ্ধ সংগীত চর্চা নিষিদ্ধ করে নয়, বরং সংগীতের সু-প্রভাবের বিস্তার ঘটিয়ে, ঘরে ঘরে তানপুরার আওয়াজ তুলেই এ্‍সমস্ত ব‍্যাধিমুক্ত সমাজ গড়ার চিন্তা করতে হবে। অন‍্য অনেক কিছুর মতো বাংলাদেশের সংগীত ঐতিহ্য একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। দল মত নির্বিশেষে সকল মানুষের এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা আশু প্রয়োজন। যারা শুধু পেট ভরানোর কথা নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন ,তাঁরা ‘মন ভরানোর’ চিন্তাটাও মাথায় রাখবেন। কারণ মন মারা গেলে মানুষের অস্তিত্বই থাকবে না।

আরিফুল হক
অভিনেতা ও লেখক

তাসনিম হোসেন