জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশে আরও বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত এবং বহু সাংবাদিক গুম, কারাবন্দি বা নির্যাতনের শিকার হতেন বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্ব, ত্যাগ ও দুঃসাহসিক স্মৃতি’ শীর্ষক একটি বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাতুল্লাহ টুটুলের সঞ্চালনায় এবং এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
সভার শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ছয়জন সাহসী সাংবাদিককে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাদের পবিত্র আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান যদি সফল না হতো, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দেশে হাসিনা পরিবারের একক ‘শেখতন্ত্র’ বা ‘শেখরাজ্য’ কায়েম করা হতো। বিগত ২০১৩ সালের ৫ মে আলেম-ওলামাদের আন্দোলন দমনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কীভাবে সেসময় দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, দৈনিক আমার দেশ এবং একুশে টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তা দেশের মানুষ এখনো ভুলে যায়নি। ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও তার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে জাতি এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা বা জবাব পায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমান গণমাধ্যমের বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করে মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে সংবাদকর্মীরা প্রধানত আওয়ামী ব্লক ও অ্যান্টি-আওয়ামী ব্লক—এই দুই ভাগে বিভক্ত থাকলেও বর্তমানে তারা বিএনপি ব্লক, জামায়াত ব্লক এবং পলাতক-গুপ্ত আওয়ামী ব্লক—এই তিন ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ সময় তিনি জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সত্য তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি তিনি বলেন, কেবল সংসদে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করলেই চলবে না; নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশনে দলীয় ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ এবং সরকারি দল হিসেবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা থেকে সরে আসার বিষয়েও জোরালো প্রশ্ন তুলতে হবে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর অন্যতম হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান। আবু সাঈদের আইকনিক ছবি এবং আন্দোলনের নানা আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ করে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাই এই আন্দোলনকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। করপোরেট মিডিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা পেশাকে কখনই করপোরেট মিডিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ করপোরেট মিডিয়ার একটি বড় অংশ বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় সংবাদ সেন্সর করার কাজে যুক্ত ছিল। তিনি আরও জানান, মোবাইল জার্নালিস্টদের ধারণ করা ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত ভবিষ্যতের বিচারপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্র এখনো পুরোপুরি ফ্যাসিবাদমুক্ত হতে পারেনি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. ওহাব মিনার জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে মোবাইল জার্নালিস্টদের দুঃসাহসিক অবদান ও সাহসিকতার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
উক্ত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এবিএম খালিদ হাসান ও ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলী।
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে এবি পার্টির বিভিন্ন স্তরের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার, গণশিক্ষা ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক, যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ এবং সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক।