এখন থেকে জন্মের পর পরই প্রতিটি শিশুর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে একটি 'ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি'। এই একটিমাত্র আইডেন্টিটি বা পরিচয়ের মাধ্যমে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এনআইডি, পাসপোর্ট ও ভূমিসেবাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা এক প্ল্যাটফর্মে মিলবে। ফলে নাগরিকদের আর আলাদা আলাদা পরিচয়পত্র বহন করতে হবে না।
‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের দূরদর্শী ভাবনায় ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য তথ্য, শিক্ষা, ভূমি সেবা ও বিআরটিএ-সহ সব বিচ্ছিন্ন সরকারি ডাটাবেজকে একটি সমন্বিত ও একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর ফলে একজন সাধারণ নাগরিক একটিমাত্র ডিজিটাল আইডির মাধ্যমেই তার প্রয়োজনীয় সব রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
স্বয়ংক্রিয় জন্ম নিবন্ধন ও কর্মপদ্ধতি
আইসিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বর্তমানে ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) পর্যায়ে রয়েছে। এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এর মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো হাসপাতালে শিশুর জন্ম হওয়া মাত্রই তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে যাবে। এরপর বাবা-মায়ের এনআইডি তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই নবজাতকের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য ডিজিটাল আইডি তৈরি হবে। তবে যে সব শিশু হাসপাতালে না হয়ে বাসায় জন্ম নেবে, তাদের তথ্য যুক্ত করার জন্যও আলাদা সহজ ব্যবস্থা রাখা হবে।
স্মার্টফোনভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট ও তথ্য সুরক্ষা
এই উদ্যোগের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ‘ডিজিটাল ওয়ালেট’ তৈরি করা। এই ওয়ালেটে নাগরিকের পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল এবং সব সরকারি নথি সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি বিভিন্ন সেবায় লগইন করা, ভার্চুয়ালি পরিচয় নিশ্চিত করা কিংবা ফিজিক্যাল বা কাগজের পরিচয়পত্রের বিকল্প হিসেবেও এই ওয়ালেট ব্যবহার করা যাবে।
অনেকের মনে তথ্য চুরি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ফাঁসের শঙ্কা থাকতে পারে, তবে কর্মকর্তারা বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন যে—সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে থাকলেও নাগরিকের নিজস্ব সম্মতি (কনসেন্ট) ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না। দেশের ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’ এবং ‘জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স নীতিমালা’ কঠোরভাবে অনুসরণ করেই পুরো ডিজিটাল কাঠামোটি পরিচালিত হবে।
আন্তর্জাতিক মডেল ও ডিপিআই বাস্তবায়ন
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ডি-স্টার’ (ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাক্সেস অ্যান্ড রিজিলিয়ান্স) প্রকল্পের আওতায় এই বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা দেশ এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল’ পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের উপযোগী একটি আধুনিক কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে।
সম্প্রতি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী মাস থেকেই দেশের প্রথম ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (ডিপিআই) প্রতিষ্ঠার মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এর আওতায় ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানি ছাড়াই দ্রুততম সময়ে যেকোনো সরকারি সেবা ঘরে বসেই পেয়ে যাবেন।
—বাংলানিউজ-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে।