২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাসহ ৭ দফা দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে সংঘটিত মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিচারের সার্বিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটের একটি প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে স্মারকলিপি পেশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ৭ দফা সংবলিত দাবিস্তবক তুলে দেন জোটের শীর্ষ নেতারা। স্মারকলিপি দেওয়ার সময় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো একাধিক শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন, যা পুরো কার্যক্রমে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। প্রতিনিধিদলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদসহ জোটে থাকা অন্যান্য দলের জ্যেষ্ঠ ও প্রথম সারির নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
জোটের পেশ করা সাত দফা দাবিতে উল্লেখ করা হয় যে, চব্বিশের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের প্রধান প্রধান অধিকাংশ ঘটনাস্থলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো শেষ হতে পারেনি। এই স্থানগুলোর সরেজমিন ও বিস্তারিত তদন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে মূল অপরাধীদের অবিলম্বে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জোটের নেতারা অভিযোগ করেন, হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অভিযুক্ত অনেক পুলিশ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এমনকি অনেকের বিরুদ্ধে অপরাধে যুক্ত থাকার তথ্য থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো সরকারি দায়িত্ব ও পদে বহাল আছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামত মিলবে, তাদের আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানান তারা।
তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনায় বলা হয়, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্তত ৬১টি জেলাতেই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা, রংপুর ও কুষ্টিয়া জেলা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে ঘটে যাওয়া অজস্র অপরাধের তদন্ত থমকে আছে। তা ছাড়া এই গণহত্যায় অভিযুক্ত তৎকালীন শাসকদল আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক চিহ্নিত অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবার এবং মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ ছাড়া গুম, হত্যাকাণ্ড সংঘটন, আলামত নষ্ট বা লাশ গুম করার মতো জঘন্য অপরাধের সাথে যেসব সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি জড়িত, তাদের সবার বিষয়ে তদন্ত কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপিতে। বলা হয়, যথাযথ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। কিন্তু বাস্তবে তদন্ত ও বিচারকার্যে অস্বাভাবিক ও হতাশাজনক ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, যা বিচারপ্রার্থী জনগণ ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর মনে মারাত্মক সংশয় ও উদ্বেগ তৈরি করছে। তাই অনতিবিলম্বে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে ১১ দলীয় এই জোট।