টানা ভারী বর্ষণের ফলে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা শিবিরে। দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন, আর নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
কক্সবাজারে কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্টি হওয়া পাহাড়ধসে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে এক নারী নিহত হওয়ার পর জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে পৌঁছেছে। এ ঘটনায় একটি শিশুসহ আরও চারজন আহত হয়েছেন।
এর আগে রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা শিবির এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সোমবার দুপুরে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নেও পাহাড়ধসে সাত বছর বয়সী শিশু মো. মিনহাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়।
সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা শিবিরে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। এতে কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরিবারের আরও সাত সদস্য আহত হলেও জীবিত উদ্ধার হন।
এর কিছুক্ষণ পর কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর শিবিরে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও উদ্ধারকর্মীরা রাতভর অভিযান চালিয়ে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ধসে চাপা পড়া কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও আলী আকবরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও কিছু অসাধু চক্র পাহাড় কাটা বন্ধ করেনি। তাঁর মতে, এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অনেকাংশেই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
টানা বর্ষণের কারণে শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও রামুর পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতেও নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এখনও প্রায় তিন লাখ মানুষ বসবাস করছেন। ফলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।