ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নিজের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির এক কোমলমতি ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মো. মহিউদ্দিন (৫৫) নামের এক প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সাথে ঘটনাটি অর্থে রফাদফা করে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা ও ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রহারের অভিযোগে মো. বাচ্চু (৫০) নামের এক সাবেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকেও আটক করা হয়েছে।
ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশাকে কলঙ্কিত করার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। নিজ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মো. মহিউদ্দিনকে, যিনি হাসাননগর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি টবগী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ছেলামত মাঝির ছেলে।
একই ঘটনায় অপরাধ গোপন করার চক্রান্তে লিপ্ত থাকা ও শিশুর পরিবারকে মারধরের অপরাধে মো. বাচ্চু নামে স্থানীয় এক সাবেক ইউপি সদস্যকেও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত বাচ্চু মেম্বার হাসাননগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. রফিকের ছেলে।
বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে বোরহানউদ্দিন থানা পুলিশের একাধিক দল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে এ দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে বুধবার সকালেই ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় সুবিচার চেয়ে বোরহানউদ্দিন থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নির্যাতিত শিশুটির দাদা। এজাহারে প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিনকে মূল অভিযুক্ত এবং ধামাচাপার চেষ্টাকারী সাবেক মেম্বার বাচ্চুকে সহযোগী অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।
পুলিশ ও মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটি হাসাননগর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। গত ১৬ জুলাই দুপুরে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন তাকে প্রলোভন ও কৌশলে ভবনের তিন তলার নির্জন একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে শিশুটির মুখ চেপে ধরে তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়।
ঘটনাটি কাউকে না জানাতে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং শিশুটির হাতে মাত্র ২০ টাকা গুঁজে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর শিশুটির হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং প্রধান শিক্ষকের এমন অপকর্মের কথা স্বজনদের কাছে প্রকাশ করে দেয়। ঘটনাটি জানার পর ভুক্তভোগী পরিবার স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুর শরণাপন্ন হলে তিনি বিষয়টি সামাজিক সমাধানের আশ্বাস দেন।
তবে অভিযোগ ওঠে, মঙ্গলবার রাতে সাবেক মেম্বার বাচ্চু ও তাঁর লোকজন নির্যাতিত পরিবারটির বাড়িতে যান এবং মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি চুপচাপ মিটিয়ে ফেলার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। পরিবারটি এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হয়ে প্রতিবাদ জানালে বাচ্চু মেম্বার ও তাঁর সহযোগীরা শিশুটির পরিবারকে শারীরিক লাঞ্ছনা ও মারধর করেন।
নির্যাতিত শিশুকন্যাটি নিজের জবানবন্দিতে আকুতি জানিয়ে বলে, "স্কুল ছুটির পর স্যার আমাকে তিন তলায় ডেকে নিয়ে টেবিলের ওপর শোয়ায় এবং আমার জামাকাপড় খুলে খারাপ কাজ করে। আমি চিৎকার করতে গেলে স্যার মুখ চেপে ধরে। পরে কাউকে বললে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে হাতে ২০ টাকা তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।"
পৈশাচিক এই ঘটনার সাথে জড়িত শিক্ষক ও সহায়তাকারী উভয়েরই দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, মামলার প্রধান অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ঘটনা গোপন করার চক্রান্তে জড়িত সহযোগী অভিযুক্ত বাচ্চুকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বুধবার বিকেলেই তাঁদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই ঘৃণ্য অপরাধের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পুলিশের আইনানুগ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।