দক্ষিণ সুদানের জংলেই অঙ্গরাজ্যে স্পষ্ট সংকেতযুক্ত মানবিক সহায়তাবাহী একটি বহরে অতর্কিত সশস্ত্র হামলায় পাঁচজন ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দ।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতিসংঘের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, সোমবার জংলেই অঙ্গরাজ্যের ডুক কাউন্টিতে স্থানীয় একটি অংশীদার সংস্থার পরিচালিত ত্রাণবহরে এই অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন ত্রাণকর্মী নিহত এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হন।
প্রাথমিক তথ্যের বরাতে ডুজারিক আরও জানান, এই সশস্ত্র হামলায় সাহায্যকর্মীদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিকও নিহত বা আহত হয়েছেন। ডুক কাউন্টির স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট ১৭ জন নিহত হওয়ার খবরও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
স্পষ্ট চিহ্নিত বহরে হামলা ও জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া
ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক সমন্বয়কারী রামানাথন বালাকৃষ্ণনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তারা এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, হামলার সময় বহরটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ‘মানবিক সহায়তাবাহী’ (Humanitarian Convoy) হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই জঘন্য হামলার পেছনে দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দক্ষিণ সুদানে দায়িত্ব পালনকালে ২৯ জন ত্রাণকর্মী ও ঠিকাদার প্রাণ হারিয়েছেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
জেডিএফ-এর ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা
হামলার শিকার বহর পরিচালনাকারী স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘জন দাউ ফাউন্ডেশন’ (জেডিএফ) জানিয়েছে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় আয়োজিত একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কর্মীরা পায়ুয়েল পায়াম থেকে পাজুত এলাকায় ফিরছিলেন। ফেরার পথেই তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ, ক্ষতিকারক ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দক্ষিণ সুদানে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও মানবিক সংকট
এদিকে জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান মিশনের (ইউএনএমআইএসএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেশটিতে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে দেশটিতে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সহিংসতায় ৭৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ৮৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সুদানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত ও সশস্ত্র সহিংসতার কারণে দক্ষিণ সুদান দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, চলমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বর্তমানে দক্ষিণ সুদানকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।