ভারতের সিকিম রাজ্যের নামচি জেলায় নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধারের পর নিখোঁজ অন্য শ্রমিকদের সন্ধানে দিনরাত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
ভারতের পাহাড়ি রাজ্য সিকিমের নামচি জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ২২ জন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। ভেতরে আটকে থাকা অন্যান্য নিখোঁজ শ্রমিকদের জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় দ্রুত বের করে আনতে বিরতিহীনভাবে দিনরাত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত সোমবার দুপুরের পরপরই উক্ত নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে আকস্মিকভাবে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ শিলার খাঁজে দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়ে থাকা তীব্র দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস হঠাৎ বের হয়ে আসার ফলেই এই বিকট বিস্ফোরণটি ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যেই সুড়ঙ্গের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে এবং চারদিক বিষাক্ত ও ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। দুর্ঘটনার সময়ে সুড়ঙ্গের বেশ গভীরে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন, যারা সবাই ধসে পড়া পাথর ও বিষাক্ত ধোঁয়ার ফাঁদে আটকা পড়েন।
রাজ্য সরকারের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা নিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত প্রতিকূল; বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা, চারদিকে জমে থাকা ধসে পড়া পাথর ও কাদাপানির কারণে ভেতরের দৃশ্যমানতা কম থাকায় চরম ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও কোনো প্রকার বিরতি না দিয়ে নিখোঁজদের খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সিকিম রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, পুরো উদ্ধার পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও শোকার্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে এবং উদ্ধারকাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করতে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সহায়তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২২টি লাশের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার চারজন শ্রমিক রয়েছেন। এছাড়া পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, আসাম ও সিকিমের একজন করে শ্রমিকের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। একই সাথে ওই প্রকল্পে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেশ কয়েকজন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী নিহতের পরিবারপ্রতি ৪ লাখ রুপি এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার রুপি করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও নিহতদের স্বজনদের জন্য ২ লাখ রুপি এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার রুপি আর্থিক অনুদান দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিবৃতিতে দুর্ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, পাথরের স্তরের ভেতরে জমা হয়ে থাকা দাহ্য গ্যাস হঠাৎ বিস্ফোরিত হওয়ায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসে পুরো সুড়ঙ্গ মুহূর্তে ঢেকে যায়। হঠাৎ করে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায় শ্রমিকরা নিরাপদ দূরত্বে বেরিয়ে আসার মতো সামান্য সময়টুকুও পাননি।