শেষবার নকআউটে ইংল্যান্ডকে হাতের গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আগামী ১৬ জুলাই আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ২০০২ সালের পর বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই তাদের প্রথম দেখা এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর বিশ্বকাপের শেষ চারের লড়াইয়ে ফিরছে এই দুই দলের ধ্রুপদী দ্বৈরথ।

ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। দুই দলের এই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালকে কেন্দ্র করে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল। যেখানে ডিয়েগো ম্যারাডোনার করা ‘হ্যান্ড অব গড’ বা হাতের গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আজো টিকে আছে।

বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দুই দল সবশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২৪ বছর আগে, ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ডেভিড বেকহ্যামের নেওয়া পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংলিশরা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই যুগ, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কখনোই এই দুই দলের দেখা মেলেনি।

অবশেষে ফুটবলপ্রেমীদের সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আগামী ১৬ জুলাই। নকআউট পর্বের হিসেবে এই দুই দল সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে (টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা)। তবে নকআউট পর্বের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত লড়াইটি হয়েছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে, যে ম্যাচে ম্যারাডোনার হাতের গোল ও ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহ্যবাহী অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই কোয়ার্টার ফাইনালটি কেবল সাধারণ কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না। এর পেছনে জড়িয়ে ছিল দুই দেশের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা, ইতিহাস ও আবেগ। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র চার বছর আগে, ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের সেই রেশ ও ক্ষত তখনো টাটকা থাকায় মাঠের লড়াইটি দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এক ভিন্ন মাত্রার মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল।

ঐতিহাসিক সেই ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবে শেষ হলেও, দ্বিতীয়র্ধের খেলা শুরু হতেই মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় দুটি গোল উপহার দেন আর্জেন্টিনার তৎকালীন অধিনায়ক ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভ হজের বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া বল ক্লিয়ার করতে একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠেন ম্যারাডোনা ও ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন। উচ্চতায় বেশ খাটো হওয়া সত্ত্বেও ম্যারাডোনা চতুরতার সঙ্গে তার বাম হাত ব্যবহার করে বলটি জালে জড়িয়ে দেন। তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের বিষয়টি খেয়াল করতে না পারায় গোলটি বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।

M্যাচ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ম্যারাডোনা রসিকতা করে বলেছিলেন, গোলটি হয়েছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ পরবর্তীতে এই মন্তব্য থেকেই গোলটি ফুটবল ইতিহাসে চিরদিনের জন্য ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে অমর হয়ে যায়। অবশ্য ওই একই ম্যাচে ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একাই ড্রিবলিং করে ইংলিশ ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে আরও একটি অবিশ্বাস্য গোল করেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের জয় নিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা এবং পরবর্তীতে সেই আসরের শিরোপাও ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তারা।

এবার দীর্ঘ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই দল। ফলে সেমিফাইনালের মহারণের আগে স্বাভাবিকভাবেই ফুটবল দুনিয়ায় নতুন করে আলোড়ন তুলেছে ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত অথচ কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায়। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বকাপে দুই দলের মোট পাঁচবারের দেখায় জয়ের বিচারে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও, নকআউট পর্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও আলোচিত দুই লড়াইয়ে (১৯৮৬ ও ১৯৯৮ সাল) শেষ হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনাই।

তাসনিম হোসেন