বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে আলবিসেলেস্তেদের এই রূপকথার জয়ের পর মাঠের রেফারিং এবং ভিএআর (VAR)-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মিশরীয় শিবির।
ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে রোমাঞ্চের সবটুকু রঙ ছড়িয়েছে আর্জেন্টিনা ও মিশর। ম্যাচের একটা বড় সময় জুড়ে দাপট দেখায় মিশরীয়রা। কিন্তু শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচটি হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। ম্যাচ শেষে মাঠের রেফারিং নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মিশরের প্রধান কোচ। তার জোরালো দাবি, টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা ও সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই মাঠের রেফারি মিশরের সঙ্গে চরম অন্যায় করেছেন।
একই সুর শোনা গেছে মিশরের তারকা ফরোয়ার্ড জিকোর কণ্ঠেও। ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিকে সরাসরি ‘জালিম’ সম্বোধন করে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন তিনি। মিশরের মূল অসন্তোষ মূলত দুটি জায়গায়—তাদের একটি নিশ্চিত গোল বাতিল করা এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি না দেওয়া।
ম্যাচের ৫৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক শটে মিশরকে ২-০ ব্যবধানের লিড এনে দিয়েছিলেন এই জিকোই। কিন্তু মাঠের রেফারি ফ্রাঁসোয়া ল্যতেক্সিয়ে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পরীক্ষা করে গোলটি বাতিল ঘোষণা করেন। রেফারি জানান, আক্রমণের সূত্রপাতের সময় মিশরের মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জার্সি টেনে ধরেন এবং তার পায়ে বুট দিয়ে আঘাত করেন। গোল বাতিলের সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে তীব্র প্রতিবাদ জানায় মিশরীয় খেলোয়াড়েরা, তবে তাতে রেফারির সিদ্ধান্ত বদলায়নি। এই ঘটনা নিয়ে ম্যাচ পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
তবে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও ফুটবল ও রেফারিং বিশেষজ্ঞরা কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্তকেই যৌক্তিক মনে করছেন। ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো ম্যাকনিক এই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “যেহেতু এটি একটি ফাউল ছিল, তাই গোলটি বাতিল করা সম্পূর্ণ নিয়মসম্মত ছিল। ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) ‘লজ অব দ্য গেম’ বা ফুটবল আইন অনুযায়ী, আক্রমণের শুরুর মুহূর্তে যদি আক্রমণকারী দলের কোনো হ্যান্ডবল, ফাউল বা অফসাইডের মতো অপরাধ ঘটে থাকে, তবে ভিএআরের মাধ্যমে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই দস্তুর।”
একই মতামত প্রকাশ করেছেন স্কটল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার অ্যালি ম্যাকওয়েস্ট। আইটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এত সুন্দর একটা গোল বাতিল হওয়াটা ফুটবলপ্রেমী হিসেবে হতাশার হলেও রেফারি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ আক্রমণকারী নিশ্চিতভাবেই প্রতিপক্ষের জার্সি টেনে ধরেছিলেন।”
ক্রীড়াভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন (ESPN)-এর একটি প্রতিবেদনে সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিসও বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। এক যুগেরও বেশি সময় রেফারির দায়িত্ব পালন করা ডেভিস বলেন, “ভিএআরের হস্তক্ষেপ ও গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত একদম সঠিক ছিল। এটি ভিএআরের জন্য একটি কঠিন ম্যাচ ছিল। মাঠের যে স্থানে ম্যাক অ্যালিস্টারের প্রাথমিক ঘটনাটি ঘটেছিল, তা একটি দ্বৈত পরিণতির অনন্য পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সেখানে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত হলে মাঠের বিপরীত প্রান্তে একটি পেনাল্টিও হয়ে যেতে পারত।”
ম্যাক অ্যালিস্টার বল ছাড়া অবস্থায় ফ্যাথির শার্ট ধরে একটি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন বলে মনে করেন ডেভিস। তবে তার মতে, এটি ছিল অত্যন্ত সামান্য এবং দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। ফলে আক্রমণকারীর বলের দখল নেওয়ার ক্ষমতার ওপর এর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি, যার কারণে এটি পেনাল্টি কিকের শর্ত পূরণ করেনি।
ম্যাচের একদম শেষ দিকে মিশরের মহাতারকা মোহামেদ সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও সঠিক বলে রায় দিয়েছেন ডেভিস। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আলভারেজের দিক থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লেগেছিল মূলত গতির কারণে। সালাহ সেখানে ফাউলের শিকার হওয়ার চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে গেছেন।”
অনেকে মিশরের বাতিল হওয়া গোলের আগের ফাউলটির সঙ্গে সালাহর পেনাল্টি না পাওয়ার ঘটনার তুলনা করার চেষ্টা করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রথম ঘটনাটিতে একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখে আঘাত করেছিলেন। কিন্তু সালাহর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল দুই খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক গতির কারণে বুটের পারস্পরিক সংস্পর্শ। ফলে রেফারি ও ভিএআর কমিটির সূক্ষ্ম ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখলেও, তা পুরোপুরি ফুটবলের নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।