সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর লুটপাট মামলার আলোচিত এক অভিযুক্তকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সরকারি পরিদর্শনে দেখা যাওয়ায় নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের একাংশ বলছেন, এমন উপস্থিতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর একসময় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বচ্ছ জলধারা, পাহাড়ি সৌন্দর্য ও সাদা পাথরের জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটলেও দীর্ঘদিনের অবৈধ পাথর উত্তোলন, দখল ও লুটপাটের কারণে এলাকাটির পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সম্প্রতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের ভোলাগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়। স্থানীয়দের নজরে আসে, সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক বহিষ্কৃত সভাপতি ও সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাহাব উদ্দিন, যিনি সাদাপাথর লুটপাট মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে পরিচিত।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি আলোচিত মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জনসমাগমস্থলগুলোতেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাদাপাথর এলাকায় অবৈধ পাথর উত্তোলন ও সরকারি জমি দখলের অভিযোগে খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কেন্দ্রীয় বিএনপি সাহাব উদ্দিনের সাংগঠনিক পদ স্থগিত করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে এবং কয়েক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন ও জ্বালানি-খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে অনুসন্ধান চালায়। একই সঙ্গে সরকারি জমি দখলের অভিযোগে জেলা বিএনপিও তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে পরিবেশকর্মীরা দাবি করেছেন, ভোলাগঞ্জ, জাফলং ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিনের অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ তাদের।
প্রতিমন্ত্রীর নদী পরিদর্শনের সময় সাহাব উদ্দিন নদীর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, নদীর তলদেশে বালু ও পাথর জমে মূল প্রবাহপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। তার মতে, মূল প্রবাহপথ পুনরুদ্ধার ছাড়া নদী রক্ষার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রতিমন্ত্রীও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দ্রুত কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নেতারা বলেছেন, পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেয়। তাদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, সাদাপাথর ও আশপাশের অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি চলমান মামলাগুলোর স্বচ্ছ ও দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। অন্যথায় প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা—উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।