সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে কওমি মাদরাসার এক শিক্ষকের হাতে শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলো কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহি এবং শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া প্রায় ছয় মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক শিক্ষক কোমলমতি এক শিশুকে লাঠি দিয়ে মারধর, লাথি এবং আছড়ে ফেলে নির্যাতন করছেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। অনেকেই দাবি করেন, ভিডিওটি পুরোনো হলেও এমন নির্যাতনের ঘটনা এখনো বন্ধ হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দারিদ্র্য, এতিম শিশুদের আশ্রয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহের কারণে প্রতিবছরই এ ধারার শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।
তবে গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেক ঘটনায় গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিন, আপস বা তদন্তের ধীরগতির কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের পরিবার থেকে দূরে অবস্থান, অভিযোগ গোপন রাখার সুযোগ, শিক্ষকদের সামাজিক প্রভাব এবং কার্যকর তদারকির অভাব নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে অনেক পরিবার সামাজিক কারণে অভিযোগ প্রকাশে অনাগ্রহী হওয়ায় প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শারীরিক শাস্তির সুযোগ নেই। তিনি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশুসুরক্ষা নীতি, স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর সরকারি তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উমর ফারুকের মতে, শিশুদের নির্যাতনের ঘটনা নিরাপদে জানানোর সুযোগ তৈরি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মাদরাসাগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারিরও প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন বোর্ডের নির্দেশনার পরিপন্থী। কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি, অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ বলেও তারা উল্লেখ করেন।
সূত্র: কালের কণ্ঠ