টরন্টোয় দুই মহাতারকার মহাযুদ্ধ: নকআউটে মুখোমুখি রোনালদো ও মদ্রিচ

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২ জুলাই ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

এক নির্মম ও আবেগময় বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। এটি কেবল কাতার বা পূর্ববর্তী কোনো মঞ্চ নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের এমন এক লড়াই, যা রূপ নিয়েছে সময়ের বিরুদ্ধে দুই কিংবদন্তির চিরন্তন যুদ্ধে। একদিকে ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে ৪০ ছুঁইছুঁই লুকা মদ্রিচ—যার হারবেন, তাঁরই হয়তো চুকে যাবে ফুটবল বিশ্বকাপের মহাকাব্য।

কানাডার টরন্টো স্টেডিয়াম চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট ভেন্যু হিসেবে পরিচিত, যার আসনসংখ্যা ৪৩ হাজার ৩৬। গ্রুপ পর্বের পাঁচটি ম্যাচে এই গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ব্যয়ে সংস্কার করা এই নান্দনিক মাঠটি এবার প্রস্তুত তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাতের সাক্ষী হতে। একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া দুই পরম বন্ধু এবার দেশের জার্সিতে একে অপরের মুখোমুখি। একজন গোল করাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, অন্যজন মাঠের সময় ও গতি নিয়ন্ত্রণ করে ফুটবলকে বানিয়েছেন কবিতা।

অসম ছন্দের পর্তুগাল ও রোনালদোর ইতিহাস পর্তুগালের গ্রুপ পর্বের যাত্রাটা ছিল কিছুটা অমিল ছন্দের। গ্রুপ ‘কে’ থেকে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে পা রেখেছে রবার্তো মার্তিনেজের শিষ্যরা। প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করার পর উজবেকিস্তানকে ৫–০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় তারা। তবে শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলহীন সমতায় মাঠ ছাড়ে। ৩ ম্যাচে অপরাজিত থেকে ৬ গোল করা এবং মাত্র ১টি হজম করা দলটি এখনো নিজেদের সেরা ছন্দ হাতড়ে বেড়াচ্ছে।

তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন ৪১ বছরের রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছেন। বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ১০ এবং পর্তুগালের জার্সিতে সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি ইউসেবিওকে। তবে পর্তুগাল শুধু রোনালদো-নির্ভর নয়; ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনিয়া ও তরুণ জোয়াও নেভেসদের নিয়ে গড়া মাঝমাঠই তাদের মূল শক্তি। ম্যাচের আগে কোচ মার্তিনেজ বলেন, "নকআউট পর্ব মানে নতুন এক বিশ্বকাপ। ক্রোয়েশিয়ার মতো অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে ভুলের কোনো সুযোগ নেই।"

অভিজ্ঞ ক্রোয়েশিয়া ও অপ্রতিরোধ্য মদ্রিচ ২০১৮ সালের রানার্সআপ এবং গত আসরের তৃতীয় স্থান অধিকারী ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ ‘এল’ থেকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে এসেছে। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৪–২ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর পানামাকে ১–০ এবং ঘানাকে ২–১ গোলে হারিয়ে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় জ্লাতকো দালিচের দল। ৩ ম্যাচে ৫ গোল করার বিপরীতে তারা হজমও করেছে ৫টি।

দলের প্রাণভোমরা লুকা মদ্রিচ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। চলতি বিশ্বকাপে এখনো কোনো গোল না পেলেও তাঁর পায়ের জাদুতে সচল রয়েছে ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ। মার্টিন বাতুরিনা ও পেতার সুচিচের মতো তরুণদের পাশে নিয়ে তিনি ম্যাচকে যেকোনো মুহূর্তে স্নায়ুর লড়াইয়ে রূপ দিতে পারেন। ক্রোয়েশিয়া কোচ দালিচ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, "এই ম্যাচ শুধু রোনালদো বনাম মদ্রিচ নয়। আসল যুদ্ধ হবে মাঝমাঠে। যে দল কম ভুল করবে, তারাই হাসবে শেষ হাসি।"

কৌশলগত যুদ্ধ ও অতীত ইতিহাস হেড-টু-হেডে সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, বৈশ্বিক মহোৎসব বা বিশ্বকাপে এই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে এদের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ইউরো ২০১৬-এর শেষ ষোলোতে, যেখানে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জিতেছিল পর্তুগাল এবং পরবর্তীতে তারাই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কৌশলগতভাবে পর্তুগাল চাইবে বল পজেশন ধরে রেখে আক্রমণ শানাতে, আর ক্রোয়েশিয়া চাইবে মদ্রিচের অভিজ্ঞতায় ম্যাচের গতি ধীর করে কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে। লেক অন্টারিওর তীরে আজ যে দল জিতবে, তারা শেষ ষোলোর টিকিটের পাশাপাশি লড়বে স্পেন অথবা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। এখন দেখার বিষয়—রাতটি কি রোনালদোর নতুন কীর্তির হবে, নাকি মদ্রিচের পায়ের জাদুতে স্তব্ধ হবে পর্তুগাল?

তাসনিম হোসেন