লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সন্ত্রাসী হামলায় নির্মমভাবে নিহত মা ও তাঁর তিন মেয়ের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার লটিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাঁদের সমাহিত করা হয়।
মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের শিকার চারজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার রাতে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় নিয়ে আসা হয়। মা ও তিন মেয়ের মরদেহ গ্রামে এসে পৌঁছালে সেখানে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর গ্রামবাসীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। নিহতদের শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য লটিয়া গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজারো মানুষ তাঁদের বাড়িতে এসে ভিড় জমান।
পরবর্তীতে লাশগুলো জানাজার উদ্দেশ্যে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত সামাজিক কবর সংলগ্ন মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নদীর তীরে খোলা মাঠে রাত ১০টায় এক বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষ অংশ নেন। জানাজা নামাজ শেষে রাত ১১টার মধ্যে অত্যন্ত শোকার্ত পরিবেশে কবরস্থানের নির্ধারিত স্থানে পাশাপাশি চারটি নতুন কবরে মা ও তিন মেয়ের লাশ দাফন করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এলাকার মানুষ অত্যন্ত অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁদের এই চিরবিদায় জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। একই পরিবারের চারজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে খুন করার ঘটনাটি আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। খবর শোনার পর থেকেই পুরো গ্রামে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে এবং সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কখন লাশগুলো গ্রামে এসে পৌঁছাবে। এই পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে বেশ গরিব হলেও সন্তানগুলো অত্যন্ত মেধাবী, নম্র, বিনয়ী ও সহজ-সরল প্রকৃতির ছিল। এই ভালো স্বভাবের কারণে গ্রামের প্রতিটি মানুষের মন জুড়োত এবং সবারই পরিবারটির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সহানুভূতি ছিল।" তিনি আরও জানান, এই ট্র্যাজেডির খবর পেয়ে শুধু লটিয়া গ্রাম নয়, বরং আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ নিহতদের বাড়িতে এসে সমবেদনা জানিয়েছেন।
নিহত শাহীনুরের দেবর জামাল হোসেন তাঁদের পারিবারিক পটভূমি তুলে ধরে জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে তাঁর বড় ভাই কামাল হোসেন জীবিকার তাগিদে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে গিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস শুরু করেন এবং কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে লেখাপড়া করাতেন। তবে সাত বছর আগে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কামাল হোসেন মারা যান।
কামাল হোসেনের মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম আর্থিক অনটনে পড়ে যায়। জামাল হোসেন উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই অসচ্ছল ও অসহায় পরিবারটি বড় ছেলে সিফাতের সামান্য আয় এবং আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় কিছু সহৃদয় মানুষের আর্থিক সহযোগিতার ওপর ভর করে কোনো রকমে বেঁচে ছিল। মা ও তিন বোনকে হারানোর পর এখন সিফাত পুরোপুরি একা ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিফাতের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া পড়াশোনা নিয়ে স্বজনেরা চরম দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।