মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফা তীব্র হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যেই রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও এই উদ্বেগের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সমসাময়িক এই উত্তেজনার পারদ নতুন করে চড়েছে হরমুজ প্রণালিতে নতুন এই রহস্যময় হামলার পর। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও (UKMTO) তাদের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে জানিয়েছে, অজ্ঞাত বস্তুর মাধ্যমে চালানো এই সুনির্দিষ্ট হামলায় আক্রান্ত তেলবাহী ট্যাংকারটির ‘ব্রিজ’ বা প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, জাহাজে থাকা সব নাবিক ও ক্রু সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছেন এবং এই বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মানুষের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের আরেকটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড টেক’ তাদের তথ্যে প্রকাশ করেছে যে, আক্রান্ত হওয়া ওই বাণিজ্যিক জাহাজটি মূলত পানামার পতাকাবাহী একটি বড় তেল ট্যাংকার, যার নাম ‘কিকু’।
তেল ট্যাংকারে এই রহস্যময় হামলার সমান্তরালেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আরেকটি বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর চালানো সাম্প্রতিক বিমান হামলার কঠোর জবাব দিতে তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা একাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে অত্যন্ত জোরালো ও সফল পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির ওই বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, ইরানের উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন বিমান বাহিনীর ‘অবৈধ ও উসকানিমূলক বিমান হামলার’ সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় এই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে এই প্রতিশোধমূলক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এই পাল্টা আক্রমণে কী ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র বা মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে এবং মার্কিন ঘাঁটির ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে নিজেদের কৌশলগত ও সামরিক কারণ দেখিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি আইআরজিসি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন)। ওইদিন ওমান উপকূলের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালির অননুমোদিত দক্ষিণ করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘এমভি এভার লাভলি’ নামের একটি কন্টেইনারবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়। ঘটনার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জোরালো দাবি তোলে যে, ওই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পেছনে সরাসরি ইরান জড়িত ছিল। এই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় এবং এর উপযুক্ত জবাব দিতে শুক্রবার (২৬ জুন) ইরানের মূল ভূখণ্ডের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত কেন্দ্রে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানোর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ইরান সরকার শুরু থেকেই সিঙ্গাপুরের জাহাজে হওয়া ড্রোন হামলার সঙ্গে নিজেদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, এটি মূলত ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সাজানো একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন মাত্র।
আইআরজিসি তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে আরও দাবি করেছে, দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের সার্বিক তদারকি ও নিরাপদ রুট নির্ধারণের একমাত্র আইনি অধিকার কেবল ইরানের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক উসকানিমূলক সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেই শান্তি সমঝোতা চুক্তি ভঙ্গের অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইরান কেবল আন্তর্জাতিক আইন মেনে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে।