‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, বেদী, ভাস্কর্য নির্মাণ এবং দেশজুড়ে ডিজিটাল কাউন্টডাউন বোর্ড স্থাপনসহ নানা খাতে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল)-এর একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এই ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান তুলে ধরেন।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও বেদী তৈরি, বিভিন্ন সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের ব্যয়বহুল ভাস্কর্য স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সময় গণনার জন্য ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড তৈরিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক 'ব্যয় বিবরণী'র অনুলিপিও তিনি সংসদে পেশ করেন।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের মোট ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় এই বিপুল অংকের বাজেট খরচ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যার পরিমাণ প্রায় ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ব্যয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রেলপথ মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৩৩ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৬ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৩ কোটি ২০ হাজার টাকা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ব্যয় করেছে ২০ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা।
পরবর্তীতে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান জানতে চান, এই বিশাল ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অডিট (নিরীক্ষা) বা দুর্নীতি তদন্তের উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে কি না এবং এতে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
উত্তরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "মুজিববর্ষের খরচ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তদন্ত বা বিশেষ অডিটের ব্যাপারে এই মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।" তবে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, কেবল মুজিববর্ষের কর্মসূচিই নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন খাতে যে ধরনের অস্বাভাবিক ব্যয় হয়েছে, সেগুলোর আর্থিক হিসাব পর্যায়ক্রমে গভীর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে দেখা হচ্ছে। সেই অভ্যন্তরীণ যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের আমলের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে আরও একটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দিয়ে বলেন, "বিষয়টি কেবল মুজিববর্ষের খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর শুধুমাত্র এক বছরের খাবারের পেছনেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় করার তথ্য পাওয়া গেছে।" বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের এই ধরনের সমস্ত আকাশচুম্বী ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের খাতগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করছে এবং সঠিক মূল্যায়ন শেষে দেশবাসীকে বিস্তারিত জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।