চার উপজেলায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি: ১৯ আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার মানুষের ঠাঁই

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং দুর্গত এলাকার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন হাজারো মানুষ।

মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি জানান, গত তিন দিন ধরে চলা এই বন্যায় দুর্গত এলাকাগুলোতে এখন খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি হ্রাস পেতে শুরু করায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় জেলা সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার পরিবার জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রাজনগর ও সদর উপজেলার ১৯টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পুরো জেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু দুর্গতদের অভিযোগ, বেশিরভাগ বন্যাকবলিত এলাকায় এখনো প্রয়োজনীয় খাদ্যসহায়তা পৌঁছায়নি। হাতেগোনা কয়েকজন সরকারি সাহায্য পেলেও সিংহভাগ মানুষই ত্রাণের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলার ৫টি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং মোট ৩৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাদুর্গতদের জরুরি সহায়তার জন্য ইতিমধ্যেই ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

আজ কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার, রহিমপুর এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা, কামারচাক, পাঁচগাঁওসহ বেশ কিছু বন্যাকবলিত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, লোকালয় থেকে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তবে অধিকাংশ কাঁচা ঘরবাড়ির ভেতরে ও বাইরে এখনো পানি জমে রয়েছে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই এখনো কোনো শুকনো খাবার বা পানীয় জল নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যাদের বসতঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে, তারা রান্নাবান্না করতে না পেরে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুর রহমান, হাওয়া বেগম ও সইফুল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গত তিন দিন ধরে আমরা পানির মধ্যে বন্দি হয়ে আছি। আমাদের এলাকার অনেকের ঘরের ভেতরেই হাঁটু পর্যন্ত পানি। এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কেউ কোনো খাবার নিয়ে আসেনি। খুব কষ্টের মধ্যে আমাদের দিন পার করতে হচ্ছে।"

সার্বিক বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ জানান, জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি গতকাল রাত থেকেই ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে পানি দ্রুত নেমে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, "বন্যার্ত মানুষের জন্য আমরা চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি এবং তা বিতরণের কাজ চলছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলেই আমরা তাদের মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগাব।"

তাসনিম হোসেন