শয্যাশায়ী রাজু বাহাদুর বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান মালিক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে অন্য একটি হাতির হিংস্র আক্রমণে গুরুতর আহত ও শয্যাশায়ী হাতি ‘রাজু বাহাদুর’-কে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এর মালিক মো. আতিকুর রহমান। হাতিটির উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করে সম্প্রতি প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে একটি লিখিত আবেদনও পাঠিয়েছেন তিনি।

মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি জানান, হাতিটির মালিক আতিকুর রহমানের বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের পাট্রাই গ্রামে এবং তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। বংশানুক্রমিকভাবে তারা হাতি লালনপালন করে আসছেন এবং বর্তমানে রাজু বাহাদুরসহ তাদের পরিবারে মোট পাঁচটি হাতি রয়েছে।

সাফারি পার্কের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ২৪ মে পার্কের হাতিশালার ভেতরে রাজু বাহাদুরের ওপর অন্য একটি পুরুষ হাতি আচমকা আক্রমণ চলায়। সেই আক্রমণের প্রচণ্ড ধাক্কায় রাজু বাহাদুর মাটিতে ছিটকে পড়ে এবং তার সামনের একটি পা ভেঙে যায়। এর পাশাপাশি অন্য পায়েও সে মারাত্মক আঘাত পায়। ঘটনার পর পরই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে একটি বড় ক্রেন এনে হাতিটিকে টেনে তুলে বালুর ঢিবির ওপর রাখা হয়। এরপর দেশের কয়েকজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। পরবর্তীতে হাতিটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় গত ৪ জুন থাইল্যান্ড থেকে দুজন বিশেষ বন্যপ্রাণী চিকিৎসককেও উড়িয়ে আনা হয়।

হাতিটির মালিক আতিকুর রহমান মুঠোফোনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "প্রায় দেড় মাস ধরে হাতিটির চিকিৎসা চলছে। বিদেশি চিকিৎসকেরাও এসে দেখে গেছেন, কিন্তু রাজু বাহাদুর এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। উল্টো দিন যত যাচ্ছে, সে তত বেশি দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। পার্কের ভেতর অন্য হাতির আক্রমণের এই ঝুঁকিটি সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের আরও আগে থেকেই নজরে রাখা উচিত ছিল।" তিনি আরও যোগ করেন, "কাগজে-কলমে হাতিটির মালিক আমি হলেও এটি মূলত দেশের একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। তাই যেকোনো মূল্যে হাতিটিকে বাঁচানো এখন সবচেয়ে জরুরি। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।"

এর আগে, গত ১ জুলাই প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে পাঠানো এক আবেদনে আতিকুর রহমান রাজু বাহাদুরের সুচিকিৎসার জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন। ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বাজারে হাতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে এটি লালনপালন ও রক্ষণাবেক্ষণে তার আরও ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে দাবি করে তিনি যথাযথ ক্ষতিপূরণ চান।

এ বিষয়ে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, পার্কে বর্তমানে ১০টি হাতি রয়েছে। এর মধ্যে চারটি পুরুষ হাতিকে সবসময়ই শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় এবং শিকলমুক্ত স্ত্রী হাতিরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় স্ত্রী হাতিরা পুরুষ হাতিদের কাছাকাছি চলে যায়। তবে হাতিশালার ভেতরে এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনা ঘটে যাবে, তা আগে থেকে অনুমান করার কোনো উপায় ছিল না।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, "হাতিটির শারীরিক অবস্থা এখনো অপরিবর্তিত ও আশঙ্কাজনক। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে দুই বার ক্রেন দিয়ে টেনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলেও সে নিজের ভার রাখতে পারেনি। অসুস্থতার কারণে সাধারণ সুস্থ হাতির তুলনায় সে খাবারও খুব কম খাচ্ছে। তবে মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসা এখনো চলমান রয়েছে এবং থাইল্যান্ডের চিকিৎসকেরাও নিয়মিত দূর থেকে হাতিটির খোঁজখবর রাখছেন।"

এদিকে বন বিভাগের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে ‘রাজু বাহাদুর’ নামের এই হাতিটিকে উদ্ধার করেছিল। সে সময় হাতিটিকে দিয়ে রাস্তাঘাটে ও বিভিন্ন হাটে-বাজারে অবৈধভাবে চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার করা হতো। খবর পেয়ে বন বিভাগ সেটিকে উদ্ধার করে সাফারি পার্কের হাতিশালায় এনে অবমুক্ত করে। বর্তমানে হাতিটির বয়স আনুমানিক ১২ বছর।

অন্যদিকে, রাজু বাহাদুরের মা ৪৩ বছর বয়সী ‘চন্দ্রতারা’ নামের অপর একটি হাতি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অসাবধানতাবশত সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করলে দেশটির বন বিভাগ তাকে আটকে রাখে। নিজের সেই হাতিটিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আতিকুর রহমান বর্তমানে ভারতের আদালতে একটি আইনি লড়াই বা মামলা লড়ছেন বলে জানা গেছে।

তাসনিম হোসেন