রাজবাড়ী আদালত কার্যালয়ে কর্মরত পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) প্রকাশ্য ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই অভিযুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ীর আদালত পাড়ায়। আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং তদন্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ও রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক।
জেলা পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, গত সোমবার (৬ জুলাই) হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ১২ সেকেন্ডের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির দৃশ্যপট দেখে ধারণা করা হয়, এটি শীতকালের কোনো এক সময়ে ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যায়, রাজবাড়ী আদালত কার্যালয়ে নিজের নির্ধারিত কক্ষে বসে আছেন এসআই ইসরাফিল হাওলাদার। এ সময় তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি নিজের পরনের জ্যাকেটের পকেট থেকে বেশ কিছু টাকা বের করে সরাসরি এসআই ইসরাফিলের হাতে তুলে দিচ্ছেন। টাকাটি হাতে নেওয়ার পর এসআই ইসরাফিল ওই ব্যক্তিকে হাত দিয়ে ইশারা করে কোনো একটি বিষয় বা দিক নির্দেশ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পুরো এই অবৈধ লেনদেনের সময় ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ব্যক্তি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছিলেন।
১২ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিষয়টি রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদের নজরে আসার পর তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সোমবার সন্ধ্যায় এক জরুরি আদেশে এসআই ইসরাফিল হাওলাদারকে আদালত কার্যালয়ের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এই ঘুষ কেলেঙ্কারির প্রকৃত সত্য ও গভীরতা উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল হককে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এমন গুরুতর ও চাক্ষুষ অভিযোগের বিষয়ে আজ দুপুরে মুঠোফোনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দাবি করেছেন অভিযুক্ত এসআই ইসরাফিল হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যেটিকে টাকা বলা হচ্ছে, সেটি আসলে কোনো টাকা ছিল না। মূলত একটি মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে একটি স্লিপ বা চিরকুট আমাকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র।’ নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘আদালতের আইনজীবীদের একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে আমার পেছনে লেগে আছে। এ ছাড়া আমাদের নিজস্ব পুলিশ স্টাফদের কেউ একজন এই নোংরা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় ও ফাঁসানোর জন্যই এই ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।’
তবে অভিযুক্তের এমন দাবিকে এখনই চূড়ান্ত বলে মানতে নারাজ তদন্ত কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল হক আজ সাংবাদিকদের বলেন, “প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশ পুলিশের সুনাম যেমন মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, তেমনই পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে সাধারণ জনমনে তীব্র বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার সাথে সাথেই মাননীয় পুলিশ সুপারের নির্দেশে অভিযুক্ত এসআই ইসরাফিল হাওলাদারকে ক্লোজড করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা নিখুঁতভাবে যাচাই–বাছাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”