জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ২০২৬ সালের চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছেন ১০০ জন পরীক্ষার্থী। শনিবার (৪ জুলাই) সকালে কেন্দ্রের ৪২০২ নম্বর কক্ষে বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষা চলাকালীন এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীরা সকলেই জামালপুর সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, শনিবার দেশব্যাপী একযোগে এইচএসসি ও সমমানের বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রের ৪২০২ নম্বর কক্ষে সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের ১০০ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থীর আসন পড়েছিল। যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলে শিক্ষকেরা তাদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেন। শিক্ষার্থীরাও সাধারণ নিয়মেই নির্ধারিত ৩ ঘণ্টা পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। তবে বিপত্তি ঘটে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর। প্রশ্নপত্র ভালো করে মেলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখতে পান যে, তাদের দেওয়া প্রশ্নপত্রটি আসলে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং সেটি ২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি করা। অর্থাৎ, সারা দেশের নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা যে প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন, এই ১০০ জন শিক্ষার্থী তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পুরোনো সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন।
এই ঘটনার পর পরীক্ষা কেন্দ্রজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। তিলা জামালি নামে এক ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "পরীক্ষা শেষ করে কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার প্রশ্নপত্রের ওপরে লেখা ‘২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী’। তার মানে এই প্রশ্নটি আমাদের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলই না। আমরা বিগত দুই বছর ধরে এই ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য দিনরাত প্রিপারেশন নিয়েছি। অথচ কর্তৃপক্ষের সামান্য একটি ভুলের কারণে আমাদের পুরো ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। আমাদের এ-প্লাস আসবে কিনা, তার কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা এখন কে দেবে?"
নুসরাত জাহান নামে আরেক পরীক্ষার্থী তাঁর দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে বলেন, "যেখানে পুরো বাংলাদেশের নিয়মিত শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিল, সেখানে আমরা ১০০ জন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ অন্য সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা দিলাম। এখন আমাদের পরীক্ষা কেমন হয়েছে, সেটি আর মূল বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো—আমরা এই বিষয়ে আদেও পাস করব নাকি ফেল করব, তা নিয়েই আমরা চরম সন্দেহের মধ্যে আছি। পাস করলেও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ আসবে কিনা, তা নিয়ে আমাদের পরিবার এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।"
এ বিষয়ে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ মীর শওকত আলম মীর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানান, প্রশ্নপত্রের এই ত্রুটিটি মূলত বোর্ডের প্যাকেজিং বা মুদ্রণজনিত ভুলের কারণে ঘটেছে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "আমাদের কেন্দ্রে যে প্রশ্নপত্রগুলো পাঠানো হয়, সেগুলোতে সাধারণত ২০টি করে প্রশ্নপত্রের একটি করে বান্ডেল বা প্যাকেট থাকে। ৪২০২ নম্বর কক্ষের পরীক্ষার্থীদের জন্য এমন ৫টি বান্ডেল খোলা হয়েছিল। প্রতিটি বান্ডেলের ওপরে স্পষ্ট অক্ষরে ‘২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র’ লেখা ছিল। যেহেতু পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে সীলগালা করা বান্ডেল খোলার কোনো নিয়ম বা সুযোগ শিক্ষকদের থাকে না, তাই শিক্ষকেরা হুবহু ওপরে লেখা দেখে বান্ডেল খুলে পরীক্ষার্থীদের মাঝে প্রশ্ন বিতরণ করে দেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর জানা যায়, ওপরে ২০২৬ লেখা থাকলেও ভেতরের প্রশ্নগুলো মূলত ২০২৫ সালের সিলেবাসের ছিল, যা অনিয়মিত ও মানোন্নয়ন (ইম্প্রুভমেন্ট) পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।"
অধ্যক্ষ আরও জানান, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি হওয়ার পরপরই তারা শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ করেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে কেন্দ্র কমিটিকে আশ্বস্ত করেছে। মীর শওকত আলম মীর বলেন, "বোর্ড থেকে আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন ওই নির্দিষ্ট ১০০ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র বা ওএমআর শিট সম্পূর্ণ আলাদা বান্ডেল করে বোর্ডে পাঠানো হয়। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এই খাতাগুলো বিশেষ বিবেচনায় নমনীয়ভাবে বা শিথিলতার সাথে মূল্যায়ন করবে এবং উত্তরপত্রগুলো ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রের কাঠামো অনুযায়ীই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখা হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়ের কোনো আশঙ্কা নেই।"
উল্লেখ্য, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রটিতে চলতি বছরের বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষায় সব মিলিয়ে নয় শতাধিক পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে অনিয়মিত ও মানোন্নয়ন (ইম্প্রুভমেন্ট) ক্যাটাগরিতে পরীক্ষা দিয়েছেন মাত্র ৬৯ জন শিক্ষার্থী। অথচ বোর্ডের প্যাকেট বিভ্রাটের কারণে অনিয়মিতদের প্রশ্ন চলে যায় নিয়মিত ১০০ জন ছাত্রীর হাতে, যা নিয়ে এখন জেলাজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।