চাঁদপুরে এতিমখানার ৪৬ টন চালের মধ্যে ২৫ টনের বেশি আত্মসাতের অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমখানাগুলোর জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত ৪৬ টন চালের মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪৬টি এতিমখানার নামে বরাদ্দ দেওয়া চালের বড় একটি অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১ টন (১ হাজার কেজি) চাল বরাদ্দ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল। কোথাও আবার চালের পরিবর্তে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, যদিও এক টন চালের বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকারও বেশি।

কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ জানান, এক টন চালের পরিবর্তে তারা পেয়েছেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। একই ধরনের অভিযোগ করেছে বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, কয়েকটি স্থানে বসতবাড়িতে নতুন ডিজিটাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এতিমখানার পরিচয় দেওয়া হলেও সেখানে এতিম শিশুদের বসবাস বা পাঠদানের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও সরকারি বরাদ্দের তালিকায় এক টন চাল পেয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, “সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমাকে মাত্র ৬০০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাতের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

মতলব উত্তর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বশির আহমেদ খান বলেন, “এতিমদের চাল আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী পিআইও কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে খাদ্যগুদাম থেকে চাল উত্তোলনের কথা থাকলেও একটি প্রভাবশালী মহল আগেভাগেই বিভিন্ন এতিমখানার প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর নিয়ে পরে বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম চাল সরবরাহ করেছে। কোথাও কোথাও চালের বদলে নামমাত্র অর্থ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্যগুদাম থেকে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাল কম দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, “আমরা প্রতিটি তালিকাভুক্ত এতিমখানার নামে এক টন করে চালের বরাদ্দপত্র (ডিও) ইস্যু করেছি। বরাদ্দের পর বাইরে কেউ অনিয়ম করে থাকলে সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।”

এদিকে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, “এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছি।”

 
 

তাসনিম হোসেন